আনডিসেন্ডেড টেস্টিস (Undescended Testis): ৮টি গুরুত্বপূর্ণ দিক
আনডিসেন্ডেড টেস্টিস বা লুকিয়ে থাকা অণ্ডকোষ হলো এমন একটি জন্মগত সমস্যা যেখানে শিশুর জন্মের পর একটি বা দুটি টেস্টিস স্বাভাবিকভাবে স্ক্রোটামে নেমে আসে না। বরং পেটের ভেতর বা কুঁচকির (inguinal canal) কোনো স্থানে আটকে থাকে। সাধারণত গর্ভাবস্থার শেষ দিকে টেস্টিস পেটের ভেতর থেকে নিচে নেমে স্ক্রোটামে আসে। কিন্তু কখনও এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হলে জন্মের সময় টেস্টিস স্ক্রোটামে দেখা যায় না। এটি শিশুদের মধ্যে একটি সাধারণ সমস্যা, বিশেষ করে প্রিম্যাচিওর শিশুদের মধ্যে।
১) পরিচিতি
আনডিসেন্ডেড টেস্টিস হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে অণ্ডকোষ স্বাভাবিক জায়গায় থাকে না। এটি জন্মগত কারণে হয় এবং সময়মতো চিকিৎসা না করলে ভবিষ্যতে প্রজনন ক্ষমতা ও হরমোন উৎপাদনে সমস্যা হতে পারে। অনেক সময় অভিভাবকরা শিশুর স্ক্রোটাম ফাঁকা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। আসলে এটি একটি পরিচিত সমস্যা, যার চিকিৎসা হলো সার্জারি।
- প্রকৃতি: অণ্ডকোষ স্ক্রোটামে না নেমে পেট বা কুঁচকিতে আটকে থাকে
- সময়: জন্মের সময় বা গর্ভাবস্থার শেষ দিকে বোঝা যায়
- ঝুঁকি: প্রিম্যাচিওর শিশুদের মধ্যে বেশি
২) প্রকারভেদ (Types)
আনডিসেন্ডেড টেস্টিসকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় — palpable এবং non-palpable।
- Palpable: টেস্টিস কুঁচকিতে থাকে, হাত দিয়ে টের পাওয়া যায়
- Non-palpable: টেস্টিস পেটের ভেতরে থাকে বা অনুপস্থিত থাকতে পারে
৩) কারণ (Causes)
আনডিসেন্ডেড টেস্টিস হওয়ার কারণ অনেক। এর মধ্যে হরমোনের ঘাটতি, টেস্টিসের পথের গঠনগত ত্রুটি, টেস্টিসের নিজস্ব বিকাশজনিত সমস্যা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া প্রিম্যাচিওর শিশুদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
- হরমোনের ঘাটতি: টেস্টিস নামার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়
- গঠনগত ত্রুটি: টেস্টিসের পথ সঠিকভাবে তৈরি না হওয়া
- বিকাশজনিত সমস্যা: টেস্টিসের নিজস্ব বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া
- প্রিম্যাচিওর শিশু: ঝুঁকি বেশি
৪) লক্ষণ (Symptoms)
আনডিসেন্ডেড টেস্টিসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো স্ক্রোটাম ফাঁকা থাকা। এক বা দুই পাশে স্ক্রোটাম ফাঁকা দেখা যায়। স্ক্রোটামের আকার ছোট হতে পারে। অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুর জন্মের পর স্ক্রোটাম পরীক্ষা করা।
- স্ক্রোটাম ফাঁকা: এক বা দুই পাশে
- আকার ছোট: স্ক্রোটামের আকার ছোট হতে পারে
৫) নির্ণয় (Diagnosis)
আনডিসেন্ডেড টেস্টিস নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। প্রথমেই Ultrasound করা হয়, যাতে টেস্টিসের অবস্থান জানা যায়। যদি টেস্টিস পেটের ভেতরে থাকে, তবে Laparoscopy করা হয়। এতে টেস্টিস দেখা যায় এবং একইসাথে চিকিৎসাও করা যায়।
- Ultrasound: টেস্টিসের অবস্থান জানা যায়
- Laparoscopy: পেটের ভেতরে টেস্টিস থাকলে দেখা ও চিকিৎসা দুটোই করা যায়
৬) চিকিৎসা (Treatment)
আনডিসেন্ডেড টেস্টিসের চিকিৎসা হলো সার্জারি, যাকে Orchidopexy বলা হয়। সাধারণত জন্মের পর ৬ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়, কারণ অনেক সময় টেস্টিস নিজে থেকেই নেমে আসে। তবে ৬ মাসের পরেও যদি টেস্টিস না নামে, তাহলে অপারেশন প্রয়োজন হয়। অপারেশনের সঠিক সময় হলো শিশুর বয়স ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে। এতে টেস্টিসকে স্ক্রোটামে স্থায়ীভাবে fix করা হয়।
- Observation: জন্মের পর ৬ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা
- Orchidopexy: টেস্টিস স্ক্রোটামে স্থায়ীভাবে fix করা
- সময়: ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে
- Outcome: ভবিষ্যতে প্রজনন ক্ষমতা ও হরমোন উৎপাদন স্বাভাবিক থাকে
৭) জটিলতা (Complications)
চিকিৎসা না করলে আনডিসেন্ডেড টেস্টিস থেকে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। টেস্টিস পেটের ভেতরে থাকলে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে টেস্টিসের ভেতরের গঠন পরিবর্তন হতে শুরু করে। এর ফলে শুক্রাণুর সংখ্যা ও মান কমে যায়, টেস্টোস্টেরন উৎপাদন কমে যায় এবং ভবিষ্যতে subfertility বা infertility হতে পারে। এছাড়া অণ্ডকোষে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। টেস্টিস সহজেই ঘুরে যেতে পারে (torsion) এবং নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কুঁচকির আশেপাশে থাকলে আঘাতের ঝুঁকিও বেশি থাকে।
- Infertility: শুক্রাণুর সংখ্যা ও মান কমে যায়
- Hormonal problem: টেস্টোস্টেরন উৎপাদন কমে যায়
- Cancer risk: ITGCN থেকে Seminoma হতে পারে
- Torsion: টেস্টিস সহজেই ঘুরে যেতে পারে
- Trauma: কুঁচকির আশেপাশে থাকলে আঘাতের ঝুঁকি বেশি
৮) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুর জন্মের পর স্ক্রোটাম পরীক্ষা করা। যদি স্ক্রোটাম ফাঁকা দেখা যায়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। অনেক সময় অভিভাবকরা মনে করেন টেস্টিস নিজে থেকেই নেমে আসবে, কিন্তু ৬ মাসের পরেও না নামলে অপারেশন জরুরি। অপারেশনের আগে ও পরে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
- পরীক্ষা: জন্মের পর স্ক্রোটাম পরীক্ষা করুন
- চিকিৎসক দেখান: স্ক্রোটাম ফাঁকা হলে দ্রুত
- অপারেশনের সময়: ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে
- নিয়ম মেনে চলা: অপারেশনের আগে ও পরে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলুন
অপারেশন সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর (FAQs)
অভিভাবকদের মনে অনেক প্রশ্ন থাকে অপারেশন নিয়ে। সাধারণত অপারেশন ছোট ছিদ্র করে করা হয় এবং কসমেটিক সেলাই দেওয়া হয়, তাই দাগ থাকে না। সেলাই কাটার প্রয়োজন হয় না। অপারেশনের পরদিন থেকেই শিশুর স্বাভাবিক চলাফেরা সম্ভব হয়। অপারেশন করতে সাধারণত ৩০–৪০ মিনিট সময় লাগে। ভবিষ্যতে শিশুর যৌন সমস্যা বা সন্তান ধারণে কোনো সমস্যা হয় না। অপারেশন করার সময় অজ্ঞান দেওয়া হয়, যা অভিজ্ঞ এনেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিরাপদভাবে করা হয়।
- দাগ: থাকে না, কসমেটিক সেলাই দেওয়া হয়
- সেলাই কাটার প্রয়োজন: নেই
- চলাফেরা: অপারেশনের পরদিন থেকেই সম্ভব
- সময়: ৩০–৪০ মিনিট
- ভবিষ্যৎ সমস্যা: যৌন বা সন্তান ধারণে কোনো সমস্যা হয় না
- অজ্ঞান: অভিজ্ঞ এনেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ
শেষ কথাঃ
আনডিসেন্ডেড টেস্টিস শিশুদের মধ্যে একটি সাধারণ জন্মগত সমস্যা। সময়মতো চিকিৎসা করলে শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাভাবিক থাকে এবং কোনো জটিলতা হয় না। অভিভাবকদের উচিত শিশুর জন্মের পর স্ক্রোটাম পরীক্ষা করা এবং কোনো অস্বাভাবিকতা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং নিয়মিত ফলো‑আপই শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464
