নাভীর হার্নিয়া (Umbilical Hernia): নবজাতকের নাভি ফুলে ওঠা — ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক
১) Umbilical Hernia কীভাবে হয়
শিশুর জন্মের সময় নাভির দড়ি (umbilical cord) পড়ে যাওয়ার পর নাভির জায়গায় একটি ছোট ছিদ্র থাকে। সাধারণত এই ছিদ্রটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি নাভির আশেপাশের পেশী ঠিকভাবে বন্ধ না হয়, তখন সেই জায়গা দিয়ে অন্ত্র বা চর্বি বাইরে ফুলে ওঠে। একে Umbilical hernia বলা হয়।
- নাভির আশেপাশের পেশী দুর্বল থাকলে
- নাভির ছিদ্র জন্মের পর ঠিকভাবে বন্ধ না হলে
- প্রিম্যাচিউর বা সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়
২) কারা বেশি আক্রান্ত হয়
Umbilical hernia সাধারণত নবজাতক ও ছোট শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। বিশেষ করে:
- প্রিম্যাচিউর শিশু (সময়ের আগে জন্ম নেওয়া)
- কম ওজনের শিশু
- যাদের নাভির দড়ি পড়ার জায়গায় পেশী দুর্বল থাকে
এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে বড় শিশু বা প্রাপ্তবয়স্কদেরও Umbilical hernia হতে পারে, তবে নবজাতকদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
৩) লক্ষণ (Symptoms)
Umbilical hernia-এর লক্ষণগুলো সহজেই চেনা যায়।
- নাভির চারপাশে ফোলাভাব দেখা যায়
- শিশুটি কান্না করলে বা কাশি দিলে ফোলাভাব আরও বড় হয়
- শিশুটি শান্ত থাকলে বা শোয়ানো অবস্থায় ফোলাভাব কমে যায়
- সাধারণত ব্যথাহীন
তবে যদি ফোলাভাবটি শক্ত হয়ে যায়, ব্যথাযুক্ত হয় বা লালচে হয়ে যায়, তখন এটি বিপজ্জনক হতে পারে। একে “Strangulated hernia” বলা হয়।
৪) কখন দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে
Umbilical hernia সাধারণত বিপজ্জনক নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। যেমন:
- ফোলাভাব শক্ত হয়ে যাওয়া
- ব্যথাযুক্ত হওয়া
- লালচে হয়ে যাওয়া
- শিশুটি অতিরিক্ত কান্না করছে
- বমি করছে বা খেতে পারছে না
এসব লক্ষণ দেখা দিলে এটি “Strangulated hernia”-এর ইঙ্গিত হতে পারে। এ অবস্থায় অন্ত্র আটকে যায় এবং রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়, যা প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
৫) জটিলতা (Complications)
Umbilical hernia সাধারণত নিজে নিজেই সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
- Strangulated hernia — অন্ত্র আটকে গিয়ে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়
- শিশুর অতিরিক্ত কান্না ও অস্বস্তি
- বমি ও খাওয়ার সমস্যা
- নাভির আশেপাশে সংক্রমণ
এই জটিলতাগুলো এড়াতে অভিভাবকদের সচেতন থাকা জরুরি।
৬) প্রতিরোধ (Prevention)
Umbilical hernia একটি জন্মগত সমস্যা, তাই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা ও সঠিক যত্নের মাধ্যমে জটিলতা এড়ানো যায়।
- শিশুর নাভি পরিষ্কার ও শুকনো রাখা
- নাভিতে কোনো ঘরোয়া ওষুধ বা তেল ব্যবহার না করা
- ফোলাভাব দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
অভিভাবকদের উচিত শিশুর নাভি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।
৬) চিকিৎসা (Treatment)
Umbilical hernia সাধারণত বিপজ্জনক নয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর বয়স ২–৩ বছরের মধ্যে নিজে নিজেই সেরে যায়। প্রায় ৯০% এর বেশি ক্ষেত্রে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই হার্নিয়া বন্ধ হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি বড় হতে পারে বা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হয়।
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো শিশুর নাভির স্বাভাবিক গঠন ফিরিয়ে আনা এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা। যদি হার্নিয়া বড় হয় বা ৩ বছর বয়সের পরও না সারে, তখন ছোট একটি অস্ত্রোপচার করে এটি ঠিক করা হয়।
- অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসা লাগে না
- ২–৩ বছরের মধ্যে নিজে নিজে সেরে যায়
- বড় হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন
৭) সার্জারি (Surgery)
Umbilical hernia-এর definitive treatment হলো সার্জারি। সার্জারির সময় নাভির আশেপাশের দুর্বল জায়গা শক্ত করে দেওয়া হয় এবং অন্ত্র বা চর্বি ভেতরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এটি একটি ছোট অস্ত্রোপচার এবং সাধারণত নিরাপদ। সার্জারির পর শিশুর নাভি স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতে আর কোনো সমস্যা থাকে না। তবে যদি হার্নিয়া “strangulated” হয়ে যায়, অর্থাৎ অন্ত্র আটকে গিয়ে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায়, তখন জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হয়।
- Elective surgery — বড় বা দীর্ঘস্থায়ী হার্নিয়ার ক্ষেত্রে
- Emergency surgery — strangulated hernia হলে
- সার্জারির পর শিশুর নাভি স্বাভাবিক হয়
৮) ফলো‑আপ (Follow-up)
সার্জারির পর শিশুর নাভি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
- নাভি শুকনো ও পরিষ্কার রাখা
- কোনো স্রাব বা লালচে ভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
- শিশুর খাওয়া‑দাওয়া ও ওজন বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ
- প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা করা
ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে সার্জারির পর কোনো জটিলতা হয়নি এবং শিশুর নাভি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।
৯) প্রগনোসিস (Prognosis)
Umbilical hernia সাধারণত নিজে নিজেই সেরে যায়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা করলে শিশুর জীবন স্বাভাবিক হয়। সার্জারির পর নাভি দিয়ে আর কোনো ফোলাভাব দেখা যায় না এবং সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে না। তবে চিকিৎসা দেরি হলে বা strangulated hernia হলে শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এজন্য সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
- অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফল খুব ভালো
- সার্জারির পর শিশুর নাভি স্বাভাবিক হয়
- Strangulated hernia হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন
১০) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ (Advice for Parents)
অভিভাবকদের উচিত শিশুর নাভি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। নাভির আশেপাশে ফোলাভাব দেখা দিলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি নিজে নিজেই সেরে যায়। তবে যদি ফোলাভাব শক্ত হয়ে যায়, ব্যথাযুক্ত হয় বা লালচে হয়ে যায়, তখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। সার্জারির পর শিশুর নাভি পরিষ্কার ও শুকনো রাখতে হবে। নিয়মিত ফলো‑আপ করাতে হবে এবং শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দিতে হবে।
- নাভি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা
- ফোলাভাব শক্ত বা ব্যথাযুক্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
- সার্জারির পর নাভি পরিষ্কার ও শুকনো রাখা
- শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া
শেষ কথাঃ (Conclusion)
Umbilical hernia হলো একটি সাধারণ জন্মগত সমস্যা, যেখানে নাভির আশেপাশের পেশীর দুর্বল জায়গা দিয়ে অন্ত্র বা চর্বি বাইরে ফুলে ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি নিজে নিজেই সেরে যায়। তবে বড় হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে সার্জারি প্রয়োজন হয়। সময়মতো চিকিৎসা করলে শিশুর জীবন স্বাভাবিক হয় এবং ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা থাকে না। অভিভাবকদের সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসা শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464
.jpg)