Polycystic Kidney Disease (PKD) ও Multicystic Dysplastic Kidney (MCDK): শিশুদের জন্মগত কিডনি সমস্যা — ৭টি গুরুত্বপূর্ণ দিক
PKD হলো একটি জেনেটিক রোগ, যেখানে কিডনির ভেতরে একাধিক সিস্ট (পানিভর্তি থলির মতো গঠন) তৈরি হয়। সময়ের সাথে সাথে এই সিস্টগুলো বড় হতে থাকে এবং কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে MCDK হলো একটি জন্মগত সমস্যা, যেখানে কিডনির স্বাভাবিক টিস্যু তৈরি না হয়ে তার জায়গায় অনেকগুলো সিস্ট তৈরি হয়। আক্রান্ত কিডনি সাধারণত কাজ করে না। এই দুটি রোগই শিশুদের মধ্যে দেখা যায় এবং সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না করলে কিডনির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
১) Polycystic Kidney Disease (PKD) কী
Polycystic Kidney Disease হলো একটি বংশগত রোগ, যেখানে কিডনির ভেতরে একাধিক সিস্ট তৈরি হয়। এই সিস্টগুলো ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এবং কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। PKD দুই ধরনের হতে পারে:
- Autosomal Recessive PKD (ARPKD): এটি মূলত নবজাতক ও ছোট শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। অনেক সময় গর্ভাবস্থাতেই আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে ধরা পড়ে। এটি বিরল হলেও অনেক বেশি গুরুতর হতে পারে।
- Autosomal Dominant PKD (ADPKD): সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের মধ্যেও প্রকাশ পেতে পারে।
PKD-এর কারণে কিডনি বড় হয়ে যায়, পেট ফুলে ওঠে, উচ্চ রক্তচাপ হয় এবং প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দেয়।
২) Multicystic Dysplastic Kidney (MCDK) কী
MCDK হলো একটি জন্মগত সমস্যা, যেখানে কিডনির স্বাভাবিক টিস্যু তৈরি না হয়ে তার জায়গায় অনেকগুলো সিস্ট তৈরি হয়। আক্রান্ত কিডনি সাধারণত কাজ করে না।
- Unilateral MCDK: শুধুমাত্র একটি কিডনি আক্রান্ত হয়। প্রায় ৯৫% শিশু এই অবস্থায় জন্ম নেয়। এটি তুলনামূলকভাবে ভালো খবর, কারণ অন্য সুস্থ কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। আক্রান্ত কিডনি সময়ের সাথে সাথে ছোট হয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্য হয়ে যায়।
- Bilateral MCDK: দুই কিডনি আক্রান্ত হয়। এটি একটি বিরল কিন্তু গুরুতর অবস্থা। শিশুর বেঁচে থাকার জন্য অবিলম্বে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হয়।
৩) PKD ও MCDK-এর কারণ
PKD একটি জেনেটিক রোগ, অর্থাৎ এটি বংশগতভাবে হয়। বাবা-মায়ের জিনের মাধ্যমে শিশুর মধ্যে এই রোগ আসে। অন্যদিকে MCDK হলো একটি জন্মগত anomaly, যেখানে ভ্রূণ অবস্থায় কিডনির স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
- PKD: জেনেটিক মিউটেশন বা বংশগত ত্রুটি।
- MCDK: ভ্রূণ অবস্থায় কিডনির বিকাশে ত্রুটি।
৪) উপসর্গ (Symptoms)
PKD ও MCDK-এর উপসর্গ বয়সভেদে ভিন্ন হতে পারে।
- জন্মের সময় বা পরবর্তীতে বড় কিডনি
- পেট ফোলা
- উচ্চ রক্তচাপ
- প্রস্রাবের সমস্যা
- বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ
MCDK-এর ক্ষেত্রে আক্রান্ত কিডনি সাধারণত কাজ করে না। যদি একটি কিডনি আক্রান্ত হয়, তবে অন্য সুস্থ কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করে।
৫) ডায়াগনসিস (Diagnosis)
PKD ও MCDK নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।
- Ultrasound: গর্ভকালীন সময়েই ধরা পড়তে পারে। কিডনির আকার ও সিস্ট দেখা যায়।
- CT Scan / MRI: কিডনির গঠন ও সিস্টের অবস্থান স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
- Renal function tests: কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।
- Urine tests: প্রস্রাবের সংক্রমণ আছে কিনা দেখা হয়।
৬) জটিলতা (Complications)
PKD ও MCDK চিকিৎসা না করলে বা দেরি হলে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।
- কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া
- উচ্চ রক্তচাপ
- প্রস্রাবের সংক্রমণ
- কিডনির স্থায়ী ক্ষতি
তাই সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
৭) প্রতিরোধ (Prevention)
PKD একটি জেনেটিক রোগ, তাই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। MCDK-ও একটি জন্মগত anomaly, তাই প্রতিরোধ করা যায় না। তবে সচেতনতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে।
- গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানো
- শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা
- প্রস্রাবে কোনো সমস্যা হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
অভিভাবকদের সচেতনতা PKD ও MCDK দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
চিকিৎসা (Treatment)
PKD ও MCDK-এর চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন, কিডনির কার্যক্ষমতা এবং শিশুর বয়সের উপর। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো কিডনির কার্যক্ষমতা যতদিন সম্ভব বজায় রাখা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা।
- PKD:
- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ — উচ্চ রক্তচাপ PKD রোগীদের মধ্যে সাধারণ সমস্যা।
- সংক্রমণ প্রতিরোধ — প্রস্রাবের সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
- কিডনির কার্যক্ষমতা পর্যবেক্ষণ — নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি।
- MCDK:
- Unilateral MCDK — সাধারণত কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। আক্রান্ত কিডনি সময়ের সাথে সাথে ছোট হয়ে যায়।
- Bilateral MCDK — গুরুতর অবস্থা। শিশুর বেঁচে থাকার জন্য ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হয়।
সার্জারি (Surgery)
PKD ও MCDK-এর ক্ষেত্রে সার্জারি সবসময় প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে অপারেশন করতে হয়।
- PKD: বড় সিস্ট থাকলে সেগুলো অপসারণ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে nephrectomy (কিডনি অপসারণ) করতে হয়।
- MCDK: আক্রান্ত কিডনি অস্বাভাবিকভাবে বড় হলে বা উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করলে nephrectomy করা হয়।
সার্জারির পর শিশুকে ICU-তে পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং কিডনির কার্যক্ষমতা দেখা হয়।
ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন
PKD ও bilateral MCDK-এর কারণে অনেক সময় কিডনির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
- Dialysis: কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট হলে রক্ত পরিষ্কার করার জন্য ডায়ালাইসিস করতে হয়।
- Kidney transplant: গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হয়। শিশুটি যথেষ্ট বড় হলে প্রতিস্থাপন করা যায়।
ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন শিশুর জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলো‑আপ (Follow-up)
PKD ও MCDK রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী ফলো‑আপ প্রয়োজন।
- নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে কিডনির আকার দেখা
- Renal scan করে কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন
- Serum creatinine পরীক্ষা করে কিডনির কার্যকারিতা দেখা
- শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন পর্যবেক্ষণ
ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে চিকিৎসার পর শিশুর কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে এবং কোনো জটিলতা হয়নি।
প্রগনোসিস (Prognosis)
PKD ও MCDK-এর প্রগনোসিস নির্ভর করে রোগের ধরন ও চিকিৎসার সময়ের উপর।
- ARPKD — নবজাতক ও ছোট শিশুদের মধ্যে গুরুতর হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা করলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।
- ADPKD — সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রকাশ পায়। তবে শিশুদের মধ্যে হলে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন।
- Unilateral MCDK — সাধারণত ভালো প্রগনোসিস। আক্রান্ত কিডনি সময়ের সাথে সাথে ছোট হয়ে যায়।
- Bilateral MCDK — গুরুতর অবস্থা। শিশুর বেঁচে থাকার জন্য ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন।
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ (Advice for Parents)
অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।
- শিশুর প্রস্রাবের প্রবাহ অস্বাভাবিক হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানো
- সার্জারি বা ডায়ালাইসিসের পর নিয়মিত ফলো‑আপ করানো
- শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া
শেষ কথাঃ (Conclusion)
Polycystic Kidney Disease (PKD) ও Multicystic Dysplastic Kidney (MCDK) হলো শিশুদের গুরুতর জন্মগত ও বংশগত কিডনি সমস্যা। সময়মতো চিকিৎসা, সার্জারি, ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অধিকাংশ শিশুই সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464
