ওভারিয়ান সিস্ট (Ovarian cyst): ৬টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

ওভারিয়ান সিস্ট হলো ডিম্বাশয়ে (ovary) তরল বা অর্ধ-তরল ভরা ছোট থলি। এটি মেয়েদের মধ্যে একটি সাধারণ সমস্যা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর নয় এবং স্বাভাবিকভাবেই কয়েক মাসের মধ্যে সরে

যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে সিস্ট বড় হয়ে গেলে পেটের ভেতরে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, ব্যথা হতে পারে এবং হজমে অসুবিধা দেখা দিতে পারে।                 

শিশুদের ক্ষেত্রেও ওভারিয়ান সিস্ট দেখা দিতে পারে, যদিও তা তুলনামূলকভাবে বিরল। ছোট সিস্ট সাধারণত কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকে, কিন্তু বড় হলে তলপেটে ফোলাভাব, ব্যথা, বমি বা হঠাৎ তীব্র ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা করলে জটিলতা এড়ানো যায়।

১) শিশুদের ক্ষেত্রে ওভারিয়ান সিস্ট

শিশুদের মধ্যে ওভারিয়ান সিস্ট সাধারণত ০–১২ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে দেখা যায় এবং অধিকাংশ সময় ছোট ও উপসর্গহীন থাকে। এগুলো সাধারণত হরমোনীয় পরিবর্তন বা জন্মগত কারণে তৈরি হয়। ছোট সিস্টগুলো রুটিন আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় ধরা পড়ে এবং চিকিৎসা ছাড়াই সরে যায়। তবে বড় হলে পেটের নিচে ভার বা ফোলাভাবের অনুভূতি, ব্যথা, খাওয়ার অনীহা বা হজমে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে সিস্ট ঘুরে গেলে (torsion) তীব্র ব্যথা, বমি এবং অস্থিরতা দেখা দেয়, যা জরুরি চিকিৎসার বিষয়। অভিভাবকদের উচিত শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

  • বয়স: সাধারণত ০–১২ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে দেখা যায়
  • লক্ষণহীনতা: ছোট সিস্টে সাধারণত কোনো উপসর্গ থাকে না
  • বড় হলে সমস্যা: ফোলাভাব, ব্যথা, হজমে অস্বস্তি

২) লক্ষণ (Symptoms)

ওভারিয়ান সিস্ট ছোট থাকলে সাধারণত কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে বড় হলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তলপেটে ফোলাভাব বা ভারী অনুভূতি, কোমর বা পেটে ব্যথা, খাওয়ার পর দ্রুত ভরাভরি লাগা, বমি বা হজমে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে গুরুতর অবস্থা হলো সিস্ট ঘুরে যাওয়া (torsion) বা ফেটে যাওয়া, যেখানে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, বমি, মাথা ঘোরা এবং অস্থিরতা দেখা দেয়। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ সময়মতো চিকিৎসা না করলে ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

  • ফোলাভাব: তলপেটে ভারী অনুভূতি
  • ব্যথা: কোমর বা তলপেটে ব্যথা
  • তীব্র ব্যথা: সিস্ট ঘুরে গেলে বা ফেটে গেলে
  • হজমে সমস্যা: বমি, খাওয়ার পর দ্রুত ভরাভরি লাগা

৩) প্রকার (Types)

ওভারিয়ান সিস্টকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়—ফাংশনাল (functional) এবং প্যাথলজিক (pathologic) সিস্ট। ফাংশনাল সিস্ট সবচেয়ে সাধারণ এবং মেয়েদের হরমোনীয় পরিবর্তনের কারণে তৈরি হয়। এগুলো সাধারণত ১–৩ মাসের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সরে যায়। অন্যদিকে প্যাথলজিক সিস্ট তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায় এবং এগুলো ডিম্বাশয়ের টিস্যুজনিত পরিবর্তন বা জন্মগত কারণে তৈরি হতে পারে। প্যাথলজিক সিস্ট বড় হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যথা ও অস্বস্তি তৈরি করে এবং কখনও কখনও সার্জারির প্রয়োজন হয়। আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমে সিস্টের ধরন নির্ণয় করা যায় এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হয়।

  • ফাংশনাল সিস্ট: সবচেয়ে সাধারণ; হরমোনীয় কারণে হয়; ১–৩ মাসে সরে যায়
  • প্যাথলজিক সিস্ট: কম দেখা যায়; টিস্যুজনিত/জন্মগত; কখনও অপারেশন দরকার

৪) চিকিৎসা (Treatment)

ওভারিয়ান সিস্টের চিকিৎসা নির্ভর করে সিস্টের আকার, প্রকৃতি এবং উপসর্গের ওপর। ছোট সিস্ট (৫ সেমি বা তার কম) সাধারণত কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না এবং নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড পর্যবেক্ষণ করলেই যথেষ্ট। অধিকাংশ ফাংশনাল সিস্ট কয়েক মাসের মধ্যে নিজে থেকেই সরে যায়। তবে বড় সিস্ট বা উপসর্গযুক্ত সিস্টে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসায় ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি একটি নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি, যেখানে ছোট ছিদ্র দিয়ে সিস্ট অপসারণ করা হয় এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। চিকিৎসার সময় শিশুর ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া সংক্রমণ প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হতে পারে এবং শিশুর খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা হয় যাতে কোষ্ঠকাঠিন্য বা হজমে সমস্যা না হয়।

  • ছোট সিস্ট: নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড পর্যবেক্ষণ
  • বড় সিস্ট: সার্জারি বা ল্যাপারোস্কপিক অপসারণ
  • অ্যান্টিবায়োটিক: সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োগ
  • খাদ্যাভ্যাস: হজমে সহায়ক খাবার, পর্যাপ্ত পানি

৫) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ

শিশুর পেটব্যথা, ফোলাভাব, বমি বা হঠাৎ তীব্র ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা করবেন না। দ্রুত শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞ বা গাইনকোলোজিস্টের কাছে নিয়ে যান। নিজে থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া বা সিস্ট ফাটানোর চেষ্টা করবেন না। নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড ফলো‑আপ করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুর যত্ন নিন। শিশুকে পর্যাপ্ত পানি পান করান, আঁশযুক্ত খাবার দিন এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে সচেতন থাকুন। অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রতিটি লক্ষণ গুরুত্বের সাথে দেখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলো‑আপ করানো।

  • ডাক্তার দেখান: অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত
  • নিজে চিকিৎসা নয়: ওষুধ বা সিস্ট ফাটানো এড়িয়ে চলুন
  • পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্যাভ্যাস: আঁশযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত পানি
  • ফলো‑আপ: নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড ও চিকিৎসকের পরামর্শ

৬) শেষ কথাঃ

ওভারিয়ান সিস্ট শিশুদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না। অধিকাংশ সিস্ট ক্ষতিকর নয় এবং নিজে থেকেই সরে যায়, তবে বড় হলে ব্যথা, অস্বস্তি বা জটিলতা তৈরি করতে পারে। সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা করলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব। অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রতিটি লক্ষণ গুরুত্বের সাথে দেখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। মনে রাখুন, শিশুর পেটে ফোলাভাব, ব্যথা বা হঠাৎ তীব্র অস্বস্তি দেখা দিলে অবহেলা করবেন না—দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। 250464