ওম্ফালোসিল (Omphalocele): নবজাতকের জন্মগত পেটের ত্রুটি ও সমাধান
ওম্ফালোসিল হলো একটি গুরুতর জন্মগত ত্রুটি (congenital defect), যেখানে শিশুর পেটের ভেতরের কিছু অঙ্গ যেমন নাড়ী, যকৃত, অন্ত্র বা পাকস্থলীর অংশ নাভীর মাধ্যমে শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসে। এগুলো একটি পাতলা ঝিল্লি (membrane) দ্বারা ঢাকা থাকে। এই অবস্থাকে neonatal surgical emergency হিসেবে ধরা হয়, কারণ ঝিল্লি ফেটে গেলে সংক্রমণ ও জীবনহানির ঝুঁকি থাকে। ওম্ফালোসিল সাধারণত জন্মের সময়ই ধরা পড়ে এবং অনেক সময় অন্যান্য জন্মগত ত্রুটি যেমন হৃদরোগ, ফুসফুসের অপর্যাপ্ত বিকাশ বা chromosomal abnormality-এর সঙ্গে যুক্ত থাকে।
এই রোগের গুরুত্ব বোঝার জন্য জানা দরকার যে নবজাতকের পেটের দেয়াল গর্ভাবস্থায় ধীরে ধীরে গঠিত হয়। যদি কোনো কারণে এই দেয়াল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না হয়, তবে অঙ্গগুলো বাইরে বেরিয়ে আসে। এজন্য ওম্ফালোসিলকে developmental defect বলা হয়। এটি শিশুর জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
১) কারণ (Causes)
ওম্ফালোসিল হওয়ার প্রধান কারণ হলো ভ্রূণের বিকাশের সময় পেটের দেয়াল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না হওয়া। এছাড়া জেনেটিক বা chromosomal ত্রুটি যেমন Trisomy 13, 18 বা 21-এর সঙ্গে এটি যুক্ত থাকতে পারে। অনেক সময় এটি অন্যান্য congenital defect বা syndrome-এর অংশ হিসেবেও দেখা যায়। অর্থাৎ, ওম্ফালোসিল একা নয়, বরং অনেক সময় অন্যান্য জন্মগত সমস্যার সঙ্গে একত্রে থাকে। এজন্য নবজাতকের ক্ষেত্রে ওম্ফালোসিল ধরা পড়লে genetic testing করা জরুরি।
- ভ্রূণের বিকাশের সময় পেটের দেয়াল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না হওয়া
- Chromosomal defect: Trisomy 13, 18, 21
- অন্যান্য congenital defect বা syndrome-এর অংশ
২) লক্ষণ (Symptoms)
ওম্ফালোসিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো জন্মের সময় শিশুর নাভীর স্থানে অঙ্গসমূহ ফোলা অবস্থায় বাইরে বেরিয়ে থাকা। এগুলো একটি পাতলা ঝিল্লি দ্বারা ঢাকা থাকে। ঝিল্লি ফেটে গেলে সংক্রমণ ও জীবনহানির ঝুঁকি থাকে। এছাড়া অনেক সময় শিশুর অন্যান্য জন্মগত সমস্যা যেমন হৃদরোগ, ফুসফুসের অপর্যাপ্ত বিকাশ ইত্যাদি থাকতে পারে। এসব লক্ষণ দেখে চিকিৎসকরা সহজেই বুঝতে পারেন যে শিশুর ওম্ফালোসিল আছে।
- নাভীর স্থানে অঙ্গসমূহ বাইরে বেরিয়ে থাকা
- পাতলা ঝিল্লি দ্বারা ঢাকা
- ঝিল্লি ফেটে গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি
- অন্যান্য জন্মগত সমস্যা যেমন হৃদরোগ, ফুসফুসের অপর্যাপ্ত বিকাশ
৩) নির্ণয় (Diagnosis)
ওম্ফালোসিল গর্ভকালেই শনাক্ত করা সম্ভব। আল্ট্রাসনোগ্রাফি (USG)-তে ভ্রূণের পেটের অঙ্গগুলো নাভীর মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসা দেখা যায়। এছাড়া amniocentesis করে chromosomal abnormality পরীক্ষা করা হয়। জন্মের পর সরাসরি শারীরিক পরীক্ষা করেই ওম্ফালোসিল শনাক্ত করা যায়। এজন্য গর্ভকালীন screening অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে শিশুর জন্মের আগেই চিকিৎসকরা প্রস্তুতি নিতে পারেন।
- গর্ভকালীন আল্ট্রাসনোগ্রাফি (USG)
- Amniocentesis – genetic abnormality পরীক্ষা
- জন্মের পর শারীরিক পরীক্ষা
৪) জন্মের পরপর যত্ন (Immediate Care)
শিশু জন্মের পরপরই ওম্ফালোসিল থাকলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হয়। শিশুকে উষ্ণ রাখা জরুরি, কারণ নবজাতক দ্রুত hypothermia-তে আক্রান্ত হতে পারে। সংক্রমণ রোধে sterile dressing ব্যবহার করা হয়। শিশুকে শিরায় তরল (IV fluids) দেওয়া হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা দেওয়া হয়। এই ধাপগুলো শিশুকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে এবং পরবর্তী surgery-এর জন্য প্রস্তুত করে।
- শিশুকে উষ্ণ রাখা
- সংক্রমণ রোধে sterile dressing
- IV fluids দেওয়া
- শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা
৫) সার্জারি (Surgical Repair)
ওম্ফালোসিলের definitive treatment হলো surgery। ছোট ওম্ফালোসিল হলে একধাপে surgery করা যায়, যেখানে অঙ্গগুলো ভেতরে ঢুকিয়ে পেটের দেয়াল বন্ধ করা হয়। বড় ওম্ফালোসিল হলে staged repair প্রয়োজন হয়। এতে কয়েক ধাপে অঙ্গগুলো ভেতরে ঢোকানো হয় এবং শেষে পেটের দেয়াল বন্ধ করা হয়। Surgery-র সময় শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ pediatric surgeon ও anesthetist-এর উপস্থিতি জরুরি।
- ছোট Omphalocele: একধাপে surgery
- বড় Omphalocele: staged repair
৬) যত্ন ও ফলো-আপ (Care & Follow-up)
অপারেশনের পর শিশুর দীর্ঘমেয়াদি যত্ন অত্যন্ত জরুরি। শিশুর পুষ্টি ও বৃদ্ধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সংক্রমণ, হজম সমস্যা বা ফুসফুসের বিকাশে সমস্যা আছে কিনা তা দেখা হয়। শিশুকে neonatologist ও pediatric surgeon-এর কাছে নিয়মিত follow-up করাতে হয়। অভিভাবকদের মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হয় এবং শিশুকে সমর্থন দিতে হয়।
- দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টি ও বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ
- সংক্রমণ ও হজম সমস্যা দেখা
- ফুসফুসের বিকাশ পর্যবেক্ষণ
- নিয়মিত follow-up
৭) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
অভিভাবকদের উচিত নবজাতকের নাভীর স্থানে অঙ্গসমূহ বাইরে বেরিয়ে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। অপারেশনের পর শিশুকে নিয়মিত follow-up করাতে হবে। শিশুর খাদ্যাভ্যাসে পর্যাপ্ত পুষ্টি রাখতে হবে। অভিভাবকদের মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে এবং শিশুকে সমর্থন দিতে হবে।
- নাভীর স্থানে অঙ্গ বাইরে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান
- অপারেশনের পর নিয়মিত follow-up করুন
- শিশুর খাদ্যাভ্যাসে পর্যাপ্ত পুষ্টি রাখুন
- শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দিন
৮) শেষ কথাঃ
Omphalocele একটি গুরুতর congenital defect। সময়মতো চিকিৎসা করলে শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। অভিভাবকদের সচেতনতা, চিকিৎসকের দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি follow-up শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে আজকের দিনে Omphalocele সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব।
