নেফ্রোব্লাস্টোমা (Nephroblastoma / Wilms’ tumour): শিশুদের কিডনির সবচেয়ে সাধারণ ক্যান্সার — ১০ টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

নেফ্রোব্লাস্টোমা (Nephroblastoma / Wilms’ tumour): শিশুদের কিডনির সবচেয়ে সাধারণ ক্যান্সার — ১০ টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

Nephroblastoma বা Wilms’ tumour হলো শিশুদের একটি বিশেষ ধরনের কিডনির ক্যান্সার। এটি সাধারণত ৭ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কিডনি ক্যান্সার হলো Nephroblastoma এবং সামগ্রিকভাবে শিশুদের ক্যান্সারের মধ্যে অন্যতম প্রধান। এই রোগে কিডনির ভেতরে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি পেয়ে একটি টিউমার তৈরি করে। অনেক সময় বাবা-মা শিশুর পেটে একটি ফোলা বা চাকাঅনুভব করেন, যা গোসল করানোর সময় বা পোশাক পরানোর সময় ধরা পড়ে।

১) Nephroblastoma কী

Nephroblastoma হলো একটি malignant tumour, অর্থাৎ এটি ক্যান্সার। এটি কিডনির ভেতরে তৈরি হয় এবং শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সাধারণত এক কিডনিতে হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে দুই কিডনিতেই হতে পারে। এটি Wilms’ tumour নামেও পরিচিত, কারণ প্রথমবার Dr. Max Wilms এই রোগটি বর্ণনা করেছিলেন।

২) কারা বেশি আক্রান্ত হয়

Nephroblastoma সাধারণত ৭ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যায়।

  • ২–৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি
  • ছেলেমেয়ে উভয়ের মধ্যে হতে পারে
  • কিছু ক্ষেত্রে জেনেটিক কারণেও হতে পারে

শিশুদের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যান্সার, কারণ সময়মতো চিকিৎসা না করলে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

৩) লক্ষণ (Symptoms)

Nephroblastoma-এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

  • পেটে একটি ফোলা বা চাকাঅনুভব করা
  • পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি
  • প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসা
  • ক্ষুধামন্দা
  • ওজন কমে যাওয়া

অনেক সময় শিশুর কোনো লক্ষণ থাকে না, শুধু পেটে ফোলা দেখা যায়। এজন্য বাবা-মায়ের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

৪) ডায়াগনসিস (Diagnosis)

Nephroblastoma নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।

  • Ultrasound: কিডনির ভেতরে টিউমার দেখা যায়।
  • CT Scan: টিউমারের আকার ও অবস্থান স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
  • MRI: টিউমারের বিস্তার নির্ণয় করা হয়।
  • Biopsy: টিউমারের কোষ পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়।

এই পরীক্ষাগুলো চিকিৎসককে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে শিশুর কিডনিতে Nephroblastoma হয়েছে কিনা এবং টিউমারের আকার কতটা বড়।

৫) জটিলতা (Complications)

Nephroblastoma চিকিৎসা না করলে বা দেরি হলে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।

  • টিউমার বড় হয়ে পেটের অন্যান্য অঙ্গকে চাপ দেয়
  • প্রস্রাবের সমস্যা
  • কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া
  • ক্যান্সার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া (metastasis)

তাই সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।

৬) প্রতিরোধ (Prevention)

Nephroblastoma একটি জন্মগত বা জেনেটিক সমস্যা হতে পারে, তাই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে।

  • শিশুর পেটে কোনো ফোলা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
  • ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা
  • শিশুর স্বাস্থ্য ও ওজন পর্যবেক্ষণ করা

অভিভাবকদের সচেতনতা Nephroblastoma দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

নেফ্রোব্লাস্টোমা (Nephroblastoma / Wilms’ tumour): চিকিৎসা, সার্জারি ও অভিভাবক পরামর্শ — ৫টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

৬) চিকিৎসা (Treatment)

Nephroblastoma-এর চিকিৎসা বহুমাত্রিক (multidisciplinary)। এতে শিশু সার্জন, শিশু ইউরোলজিস্ট, অনকোলজিস্ট এবং রেডিওলজিস্ট একসাথে কাজ করেন। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো টিউমার অপসারণ করা, ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়া রোধ করা এবং শিশুর জীবন বাঁচানো।

  • Neoadjuvant chemotherapy: প্রথমে কেমোথেরাপি দিয়ে টিউমারের আকার ছোট করা হয়।
  • Surgery: টিউমারসহ আক্রান্ত কিডনি অপসারণ করা হয়।
  • Adjuvant chemotherapy: অপারেশনের পর পুনরায় কেমোথেরাপি দেওয়া হয়।
  • Radiotherapy: কিছু ক্ষেত্রে টিউমার ছড়িয়ে পড়লে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়।

চিকিৎসার ধরন নির্ভর করে টিউমারের আকার, অবস্থান এবং ক্যান্সারের বিস্তারের উপর।

৭) সার্জারি (Surgery)

Nephroblastoma-এর definitive treatment হলো সার্জারি। সাধারণত Nephrectomy করা হয়, অর্থাৎ আক্রান্ত কিডনি অপসারণ করা হয়।

  • Simple nephrectomy: একটি কিডনি অপসারণ করা হয়।
  • Radical nephrectomy: কিডনি ছাড়াও আশেপাশের টিস্যু ও লিম্ফ নোড অপসারণ করা হয়।
  • Bilateral nephroblastoma: দুই কিডনিতে হলে আংশিক nephrectomy করা হয়।

সার্জারির পর শিশুকে ICU-তে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

৮) কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি

Nephroblastoma চিকিৎসায় কেমোথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • Neoadjuvant chemotherapy — অপারেশনের আগে টিউমার ছোট করতে দেওয়া হয়।
  • Adjuvant chemotherapy — অপারেশনের পর পুনরায় দেওয়া হয়।
  • Radiotherapy — টিউমার ছড়িয়ে পড়লে বা advanced stage হলে দেওয়া হয়।

কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি শিশুর শরীরে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যেমন চুল পড়া, দুর্বলতা, বমি ইত্যাদি। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

৯) ফলো‑আপ (Follow-up)

Nephroblastoma রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী ফলো‑আপ প্রয়োজন।

  • নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও CT Scan করে টিউমার পুনরায় হচ্ছে কিনা দেখা
  • রক্ত পরীক্ষা করে কিডনির কার্যক্ষমতা দেখা
  • শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন পর্যবেক্ষণ
  • কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ

ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে চিকিৎসার পর শিশুর শরীরে টিউমার পুনরায় হয়নি এবং কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।

১০) প্রগনোসিস (Prognosis)

Nephroblastoma-এর প্রগনোসিস সাধারণত ভালো, যদি সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা যায়।

  • সঠিক সময়ে চিকিৎসা করলে অধিকাংশ শিশুই আরোগ্য লাভ করে।
  • Early stage-এ চিকিৎসা করলে ফলাফল অত্যন্ত ভালো হয়।
  • Advanced stage-এ চিকিৎসা করলে ফলাফল তুলনামূলকভাবে কম ভালো হয়।

বর্তমানে সার্জারি ও কেমোথেরাপির উন্নতির ফলে Nephroblastoma রোগীদের বেঁচে থাকার হার অনেক বেড়েছে।

১১) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ (Advice for Parents)

অভিভাবকদের উচিত শিশুর পেটে কোনো ফোলা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।

  • শিশুর পেটে ফোলা বা অস্বাভাবিকতা দেখলে অবহেলা না করা
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানো
  • সার্জারি ও কেমোথেরাপির পর নিয়মিত ফলো‑আপ করানো
  • শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া

শেষ কথাঃ (Conclusion)

Nephroblastoma বা Wilms’ tumour হলো শিশুদের সবচেয়ে সাধারণ কিডনির ক্যান্সার। এটি সাধারণত ৭ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে সার্জারি ও কেমোথেরাপির মাধ্যমে অধিকাংশ শিশুই আরোগ্য লাভ করে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464