নবজাতকের মেরুদণ্ডের টিউমার (Myelomeningocele): ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

নবজাতকের মেরুদণ্ডের টিউমার (Myelomeningocele): ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

মাইলোমেনিনগোসিল (Myelomeningocele) হলো স্পাইনা বাইফিডার সবচেয়ে গুরুতর ধরন। স্পাইনা বাইফিডা নিজেই একটি নিউরাল টিউব ডিফেক্ট, যা গর্ভাবস্থার প্রথম চার সপ্তাহে ভ্রূণের নিউরাল টিউব সঠিকভাবে বন্ধ না হলে ঘটে। এর ফলে মেরুদণ্ডের হাড়ে ফাঁক তৈরি হয় এবং স্নায়ুরজ্জু ও তার চারপাশের ঝিল্লি বাইরে বেরিয়ে আসে।

মাইলোমেনিনগোসিলে spinal cord, meninges এবং cerebrospinal fluid (CSF) একসঙ্গে একটি থলির মতো বাইরে বেরিয়ে আসে। থলির উপর সাধারণত চামড়া থাকে না, শুধু একটি পাতলা পর্দা থাকে, যা সহজেই ফেটে যেতে পারে। এজন্য এটি জন্মের পরপরই একটি জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়।

১) রোগের প্রকৃতি ও গঠন (Nature & Structure)

মাইলোমেনিনগোসিলে মেরুদণ্ডের স্নায়ুরজ্জু (spinal cord) এবং স্নায়ুর অংশ মেরুদণ্ডের হাড়ের ফাঁক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। থলির ভেতরে থাকে স্নায়ু, meninges এবং CSF। যেহেতু থলির উপর চামড়া থাকে না, তাই এটি খুবই নাজুক এবং সহজেই ফেটে যেতে পারে। ফেটে গেলে spinal cord ও central nervous system সরাসরি বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে আসে, যা গুরুতর সংক্রমণ ও স্নায়ুর ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়।

  • Spinal cord ও স্নায়ু বাইরে বেরিয়ে আসে
  • থলির ভেতরে meninges ও CSF থাকে
  • থলির উপর চামড়া থাকে না, শুধু পাতলা পর্দা
  • সহজেই ফেটে গিয়ে সংক্রমণ হতে পারে

২) সম্পর্কিত জটিলতা (Associated Conditions)

মাইলোমেনিনগোসিলের সঙ্গে অনেক সময় অন্যান্য গুরুতর সমস্যা যুক্ত থাকে। যেমন:

  • হাইড্রোকেফালাস: মাথার ভেতরে অতিরিক্ত CSF জমে গিয়ে মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করে।
  • পায়ের দুর্বলতা বা পক্ষাঘাত: শিশুর হাঁটার ক্ষমতা কমে যায় বা সম্পূর্ণ পক্ষাঘাত হতে পারে।
  • মূত্রাশয়ের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা: প্রস্রাব ঝরে যেতে পারে বা নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে।
  • অন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা: মলদ্বারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পায়খানা ঝরে যেতে পারে।

৩) প্রতিরোধ (Prevention)

মাইলোমেনিনগোসিল প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গর্ভকালীন সময়ে মাকে পর্যাপ্ত ফলিক এসিড দেওয়া। ফলিক এসিড নিউরাল টিউবের সঠিক গঠনে সাহায্য করে। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে ফলিক এসিডের অভাব থাকলে নিউরাল টিউব ডিফেক্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এজন্য গর্ভধারণের আগে থেকেই মাকে ফলিক এসিড ট্যাবলেট খাওয়ানো উচিত।

  • গর্ভকালীন সময়ে পর্যাপ্ত ফলিক এসিড গ্রহণ
  • গর্ভধারণের আগে থেকেই ফলিক এসিড ট্যাবলেট খাওয়া
  • মায়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখা

৪) জন্মের পর অবস্থা (Condition after birth)

জন্মের পরপরই মাইলোমেনিনগোসিল একটি জরুরি অবস্থা হিসেবে ধরা হয়। থলিটি খুবই নাজুক এবং সহজেই ফেটে যেতে পারে। ফেটে গেলে spinal cord ও central nervous system বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে আসে। এর ফলে মেনিনজাইটিস (Meningitis) বা মস্তিষ্কের গুরুতর সংক্রমণ হতে পারে, যা শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এছাড়া স্নায়ুর ক্ষতি আরও বাড়তে পারে, ফলে শিশুর হাঁটার ক্ষমতা, মূত্রাশয় ও অন্ত্রের কার্যকারিতা আরও খারাপ হতে পারে। তাই জন্মের পরপরই থলিটি ডিওডার্ম বা ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়, যেন আঘাত না লাগে এবং সংক্রমণ না হয়।

  • জন্মের পরপরই জরুরি অবস্থা
  • থলি ফেটে গেলে সংক্রমণ ও স্নায়ুর ক্ষতি
  • মেনিনজাইটিসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়
  • ডিওডার্ম বা ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখা জরুরি

৫) চিকিৎসার জরুরিতা (Urgency of Treatment)

মাইলোমেনিনগোসিল জন্মের পরপরই একটি সার্জিক্যাল ইমার্জেন্সি হিসেবে বিবেচিত হয়। গুরুতর সংক্রমণ ও আরও স্নায়বিক ক্ষতি প্রতিরোধ করার জন্য দ্রুত অপারেশন প্রয়োজন। একজন শিশু সার্জন বা শিশু নিউরোসার্জন অপারেশনের সময়কাল ও ফলাফল সম্পর্কে পরামর্শ দেন এবং অপারেশন করেন। অপারেশন দেরি হলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। থলি ফেটে গেলে spinal cord ও central nervous system বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে আসে, ফলে মেনিনজাইটিস হতে পারে। এছাড়া স্নায়ুর ক্ষতি আরও বাড়তে পারে, যা শিশুর হাঁটার ক্ষমতা, মূত্রাশয় ও অন্ত্রের কার্যকারিতা আরও খারাপ করে দেয়।

  • জন্মের পরপরই সার্জিক্যাল ইমার্জেন্সি
  • দ্রুত অপারেশন প্রয়োজন
  • দেরি হলে সংক্রমণ ও স্নায়ুর ক্ষতি বাড়ে
  • শিশুর জীবন রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি

৬) চিকিৎসা পদ্ধতি (Treatment Methods)

মাইলোমেনিনগোসিলের প্রধান চিকিৎসা হলো অপারেশন। জন্মের পরপরই এটি একটি সার্জিক্যাল ইমার্জেন্সি হিসেবে ধরা হয়। অপারেশনের মাধ্যমে থলিটি সরিয়ে মেরুদণ্ডের ফাঁক বন্ধ করা হয় এবং স্নায়ুরজ্জুকে সুরক্ষিত করা হয়। একজন শিশু সার্জন বা শিশু নিউরোসার্জন এই অপারেশন করেন।অপারেশনের লক্ষ্য হলো সংক্রমণ প্রতিরোধ করা, স্নায়ুর ক্ষতি কমানো এবং শিশুর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা রক্ষা করা। অপারেশন যত দ্রুত করা যায়, তত ভালো ফল পাওয়া যায়। দেরি হলে সংক্রমণ ও স্নায়ুর ক্ষতি স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।

  • জন্মের পরপরই অপারেশন জরুরি
  • থলি সরিয়ে মেরুদণ্ডের ফাঁক বন্ধ করা হয়
  • সংক্রমণ প্রতিরোধ ও স্নায়ুর সুরক্ষা
  • দেরি হলে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে

৭) ফলো‑আপ (Follow-up)

অপারেশনের পর শিশুর দীর্ঘমেয়াদি ফলো‑আপ অত্যন্ত জরুরি। এতে দেখা হয় শিশুর হাঁটার ক্ষমতা, পায়ের শক্তি, মূত্রাশয় ও অন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ। ফিজিওথেরাপি শিশুর হাঁটা ও পায়ের শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। নিয়মিত MRI করে দেখা হয় spinal cord আবার tethered হয়েছে কিনা। শিশুর বৃদ্ধি অনুযায়ী নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে, তাই দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য।

  • শিশুর হাঁটার ক্ষমতা ও পায়ের শক্তি দেখা
  • মূত্রাশয় ও অন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ পর্যবেক্ষণ
  • ফিজিওথেরাপি চালিয়ে যাওয়া
  • নিয়মিত MRI করে tethered cord দেখা

৮) প্রগনোসিস (Prognosis)

সময়মতো অপারেশন করলে অনেক শিশুর চলাফেরা ও মূত্র নিয়ন্ত্রণ ভালো থাকে। তবে ফলাফল নির্ভর করে spinal cord কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার উপর। দেরি হলে স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি হতে পারে। শিশুর হাঁটার ক্ষমতা কমে যেতে পারে, মূত্রাশয় ও অন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। এজন্য সময়মতো অপারেশন ও ফলো‑আপ অত্যন্ত জরুরি।

  • সময়মতো অপারেশন করলে ভালো ফল পাওয়া যায়
  • ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী ফলাফল ভিন্ন হয়
  • দেরি হলে স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি হতে পারে

৯) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ

অভিভাবকদের উচিত শিশুর অপারেশনের পর নিয়মিত ফলো‑আপ করানো। শিশুর হাঁটা, পায়ের শক্তি, মূত্রাশয় ও অন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ফিজিওথেরাপি চালিয়ে যেতে হবে।অভিভাবকদের মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে এবং শিশুকে সমর্থন দিতে হবে। শিশুর ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।

  • নিয়মিত ফলো‑আপ করানো
  • শিশুর হাঁটা ও পায়ের শক্তি পর্যবেক্ষণ
  • মূত্রাশয় ও অন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ দেখা
  • ফিজিওথেরাপি চালিয়ে যাওয়া

১০) শেষ কথাঃ (Conclusion)

মাইলোমেনিনগোসিল হলো স্পাইনা বাইফিডার সবচেয়ে গুরুতর ধরন। জন্মের পরপরই এটি একটি সার্জিক্যাল ইমার্জেন্সি হিসেবে ধরা হয়। সময়মতো অপারেশন করলে শিশুর জীবনমান ভালো থাকে। দেরি হলে স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি হতে পারে। অভিভাবকদের সচেতনতা, চিকিৎসকের দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলো‑আপের মাধ্যমে শিশুর ভবিষ্যৎ উন্নত করা সম্ভব। 250464