ইনগুইনাল হার্নিয়া (Inguinal Hernia): ৯টি গুরুত্বপূর্ণ দিক
ইনগুইনাল হার্নিয়া হলো শিশুদের মধ্যে একটি সাধারণ জন্মগত সমস্যা। এখানে পেটের ভেতরের অঙ্গ যেমন নাড়ী বা ওমেনটাম ইনগুইনাল ক্যানাল দিয়ে নিচের দিকে বেরিয়ে আসে। শিশুর জন্মের সময় একটি ছোট টিউব থাকে, যাকে processus vaginalis বলা হয়। সাধারণত এটি জন্মের আগে বা পরে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি এটি খোলা থেকে যায়, তখন পেটের অঙ্গ এই পথ দিয়ে বের হয়ে আসে এবং ইনগুইনাল হার্নিয়া তৈরি হয়। এটি শিশুদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সার্জারি সমস্যা, যা সময়মতো চিকিৎসা না করলে গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
১) পরিচিতি
হার্নিয়া শব্দটি এসেছে গ্রিক ভাষা থেকে, যার অর্থ হলো "বেরিয়ে আসা"। ইনগুইনাল হার্নিয়া হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে পেটের ভেতরের অঙ্গ কুঁচকির অংশ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। শিশুদের মধ্যে এটি সাধারণত জন্মগত কারণে হয়। নবজাতক বা প্রিম্যাচিওর শিশুদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। অনেক সময় অভিভাবকরা শিশুর কুঁচকির অংশে ফোলা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। আসলে এটি একটি পরিচিত সমস্যা, যার চিকিৎসা হলো সার্জারি।
- প্রকৃতি: পেটের অঙ্গ ইনগুইনাল ক্যানাল দিয়ে বেরিয়ে আসে
- কারণ: Processus vaginalis বন্ধ না হওয়া
- শিশুদের মধ্যে: নবজাতক ও প্রিম্যাচিওর শিশুদের মধ্যে বেশি
২) কারা বেশি আক্রান্ত হয়
ইনগুইনাল হার্নিয়া সাধারণত ছেলেশিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের ঝুঁকি অনেক বেশি। এছাড়া প্রিম্যাচিওর শিশুদের মধ্যে হার্নিয়ার ঝুঁকি আরও বেশি থাকে। কারণ তাদের জন্মের সময় অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুরোপুরি বিকশিত হয় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছেলেশিশুদের মধ্যে ইনগুইনাল হার্নিয়া হওয়ার সম্ভাবনা মেয়েদের তুলনায় প্রায় ৮ গুণ বেশি। প্রিম্যাচিওর শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩০% ক্ষেত্রে হার্নিয়া দেখা যায়। তাই অভিভাবকদের উচিত জন্মের পর থেকেই শিশুর কুঁচকির অংশে কোনো অস্বাভাবিক ফোলা আছে কিনা তা লক্ষ্য করা।
- ছেলেশিশু: মেয়েদের তুলনায় অনেক বেশি আক্রান্ত হয়
- প্রিম্যাচিওর শিশু: ঝুঁকি বেশি
- গবেষণা তথ্য: ছেলেদের মধ্যে ৮ গুণ বেশি
৩) লক্ষণ (Symptoms)
ইনগুইনাল হার্নিয়ার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো কুঁচকির অংশে বা অণ্ডকোষের উপরে ফোলাভাব। শিশুর কান্না, কাশি বা দাঁড়ানোর সময় ফোলাটা বড় হয়। আবার ঘুমালে বা চেপে ধরলে ফোলা কমে যায়। সাধারণত এটি ব্যথাহীন থাকে। তবে যদি হার্নিয়া আটকে যায় (incarcerated hernia), তখন তীব্র ব্যথা, বমি, পেট ফোলা ও শিশুর অস্থিরতা দেখা দেয়। এটিকে strangulated hernia বলা হয়, যা একটি জরুরি অবস্থা।
অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফোলার আকার পরিবর্তন লক্ষ্য করা। যদি ফোলা কখনো বড় হয় আবার কখনো ছোট হয়, তবে এটি হার্নিয়ার লক্ষণ। তবে যদি ফোলা সবসময় বড় থাকে এবং শিশুর অস্থিরতা দেখা দেয়, তবে এটি বিপজ্জনক অবস্থা।
- ফোলাভাব: কুঁচকি বা অণ্ডকোষের উপরে
- আকার পরিবর্তন: কান্না বা কাশিতে বড় হয়, ঘুমালে ছোট হয়
- ব্যথাহীন: সাধারণত ব্যথা থাকে না
- জরুরি অবস্থা: আটকে গেলে তীব্র ব্যথা, বমি, পেট ফোলা
৪) ধরন (Types)
ইনগুইনাল হার্নিয়া দুই ধরনের হতে পারে: Indirect এবং Direct। শিশুদের মধ্যে প্রায় সব ক্ষেত্রেই Indirect inguinal hernia দেখা যায়। Direct inguinal hernia শিশুদের মধ্যে খুবই বিরল, সাধারণত বড়দের মধ্যে দেখা যায়। Indirect hernia জন্মগত কারণে হয়, যেখানে processus vaginalis খোলা থাকে। Direct hernia সাধারণত বয়স বাড়ার সাথে সাথে পেটের দেয়াল দুর্বল হয়ে গেলে হয়।
Indirect inguinal hernia হলো শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এটি সাধারণত জন্মের সময় থেকেই থাকে এবং শিশুর কান্না বা কাশির সময় ফোলা বড় হয়ে যায়। Direct inguinal hernia শিশুদের মধ্যে খুবই বিরল। এটি সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়, যেখানে পেটের দেয়াল দুর্বল হয়ে যায়।
- Indirect inguinal hernia: শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়
- Direct inguinal hernia: শিশুদের মধ্যে বিরল, বড়দের মধ্যে হয়
৫) পরীক্ষা (Diagnosis)
ইনগুইনাল হার্নিয়া নির্ণয়ের জন্য সাধারণত শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসক শিশুর কুঁচকির অংশে ফোলা দেখে হার্নিয়া সন্দেহ করেন। আল্ট্রাসনোগ্রাফি (USG) করে নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে অনেক সময় আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে ধরা নাও পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হয় শিশুর ফোলার ছবি বা ভিডিও করে চিকিৎসককে দেখাতে। এতে রোগ নির্ণয় সহজ হয়।
শারীরিক পরীক্ষায় চিকিৎসক শিশুকে দাঁড় করিয়ে বা কাশতে বলেন। এ সময় ফোলা বড় হয়। আবার শুয়ে পড়লে ফোলা ছোট হয়। এটি হার্নিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। আল্ট্রাসনোগ্রাফি করলে পেটের অঙ্গ ইনগুইনাল ক্যানাল দিয়ে বেরিয়ে আসছে কিনা তা দেখা যায়।
- শারীরিক পরীক্ষা: কুঁচকির ফোলা দেখে সন্দেহ
- আল্ট্রাসনোগ্রাফি: নিশ্চিত হওয়ার জন্য
- ছবি/ভিডিও: অনেক সময় রোগ নির্ণয়ে সহায়ক
৬) চিকিৎসা (Treatment)
ইনগুইনাল হার্নিয়ার একমাত্র চিকিৎসা হলো অপারেশন, যাকে Herniotomy বলা হয়। এই অপারেশনে সেই পথ বা ছিদ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেখান দিয়ে হার্নিয়া বের হয়। হার্নিয়ার স্যাক কেটে ফেলা হয় এবং অঙ্গকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কোনো ওষুধ বা ঘরোয়া চিকিৎসায় হার্নিয়া ভালো হয় না। তাই রোগ নির্ণয়ের পর দ্রুত অপারেশন করা জরুরি। দেরি করলে জটিলতা বাড়তে পারে।
- Observation: হার্নিয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর নয়
- Herniotomy: একমাত্র চিকিৎসা
- সময়: রোগ নির্ণয়ের পর দ্রুত অপারেশন
- Outcome: নিরাপদ ও কার্যকর
৭) জটিলতা (Complications)
হার্নিয়া সময়মতো চিকিৎসা না করলে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। পেটের নাড়ী কুঁচকি দিয়ে বের হয়ে আটকে যেতে পারে, যাকে Incarceration বলা হয়। এতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং টিস্যু মারা যেতে শুরু করে, যাকে Strangulation বলা হয়। এর ফলে তীব্র ব্যথা, বমি, পেট ফোলা ও শিশুর অস্থিরতা দেখা দেয়। অনেক সময় নাড়ী কেটে ফেলতে হয়। তাই হার্নিয়ার ক্ষেত্রে অপারেশন দেরি করা উচিত নয়।
- Incarceration: হার্নিয়া আটকে যাওয়া
- Strangulation: রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে টিস্যু মারা যাওয়া
- Intestinal obstruction: নাড়ী বন্ধ হয়ে যাওয়া
৮) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
শিশুর কুঁচকিতে ফোলা দেখা দিলে অভিভাবকদের উচিত দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া। অনেক সময় অভিভাবকরা মনে করেন ফোলা নিজে থেকেই ভালো হয়ে যাবে, কিন্তু হার্নিয়ার ক্ষেত্রে তা হয় না। বরং দেরি করলে জটিলতা বাড়ে। অভিভাবকদের উচিত শিশুকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো পরিবর্তন হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। অপারেশনের আগে ও পরে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
- পর্যবেক্ষণ: শিশুর কুঁচকির ফোলা নিয়মিত লক্ষ্য করুন
- চিকিৎসকের পরামর্শ: দেরি না করে দ্রুত ডাক্তার দেখান
- অপারেশনের আগে: নির্দিষ্ট সময় খাবার-পানি বন্ধ রাখতে হয়
- অপারেশনের পরে: চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া খাবার-পানি দেবেন না
৯) অপারেশন সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর (FAQs)
অভিভাবকদের মনে অনেক প্রশ্ন থাকে অপারেশন নিয়ে। সাধারণত অপারেশন ছোট ছিদ্র করে করা হয় এবং কসমেটিক সেলাই দেওয়া হয়, তাই দাগ থাকে না। সেলাই কাটার প্রয়োজন হয় না। অপারেশনের পরদিন থেকেই শিশুর স্বাভাবিক চলাফেরা সম্ভব হয়। অপারেশন করতে সাধারণত ৩০–৪০ মিনিট সময় লাগে। ভবিষ্যতে শিশুর যৌন সমস্যা বা সন্তান ধারণে কোনো সমস্যা হয় না। অপারেশন করার সময় অজ্ঞান দেওয়া হয়, যা অভিজ্ঞ এনেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিরাপদভাবে করা হয়।
- দাগ: থাকে না, কসমেটিক সেলাই দেওয়া হয়
- সেলাই কাটার প্রয়োজন: নেই
- চলাফেরা: অপারেশনের পরদিন থেকেই সম্ভব
- সময়: ৩০–৪০ মিনিট
- ভবিষ্যৎ সমস্যা: যৌন বা সন্তান ধারণে কোনো সমস্যা হয় না
- অজ্ঞান: অভিজ্ঞ এনেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ
শেষ কথাঃ
ইনগুইনাল হার্নিয়া শিশুদের মধ্যে একটি সাধারণ জন্মগত সমস্যা, যা নিজে থেকে ভালো হয় না। একমাত্র চিকিৎসা হলো অপারেশন। সময়মতো চিকিৎসা করলে শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাভাবিক থাকে এবং কোনো জটিলতা হয় না। অভিভাবকদের উচিত শিশুর কুঁচকিতে কোনো ফোলা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464
