কিডনিতে প্রস্রাব জমে ফুলে ওঠা (Hydronephrosis): শিশুদের জন্মগত ও অর্জিত সমস্যা — ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক
১) কখন দেখা যায়
Hydronephrosis শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ধরা পড়ে।
- গর্ভকালীন সময়ে — antenatal ultrasound-এ ধরা পড়ে।
- জন্মের পর — প্রস্রাবের সমস্যা বা সংক্রমণের মাধ্যমে ধরা পড়ে।
- বড় শিশুদের ক্ষেত্রে — অন্য রোগের জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে গিয়ে ধরা পড়ে।
অর্থাৎ অনেক সময় এটি লক্ষণবিহীন থাকে এবং incidentally detected হয়।
২) কারণ (Causes)
Hydronephrosis হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো:
- PUJ obstruction: কিডনি ও মূত্রনালীর সংযোগস্থলে সংকোচন। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
- Vesico-ureteric reflux (VUR): প্রস্রাব ব্যাক-ফ্লো হয়ে কিডনিতে ফিরে যায়।
- Posterior urethral valve (PUV): ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে মূত্রথলির নিচে বাধা থাকে।
- মূত্রনালীর পাথর: প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে।
- রক্তনালীর ত্রুটি: কিডনির আশেপাশে অস্বাভাবিক রক্তনালী থাকলে প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা হয়।
এই কারণগুলো জন্মগত বা অর্জিত হতে পারে।
৩) লক্ষণ (Symptoms)
Hydronephrosis অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
- পেট ফোলা
- প্রস্রাবের সংক্রমণ
- জ্বর
- ওজন না বাড়া
- বমি
শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে সমস্যা বা প্রস্রাব আটকে থাকার লক্ষণও দেখা যায়।
৪) পরীক্ষা (Investigations)
Hydronephrosis নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।
- Ultrasound: কিডনির পেলভিস ও ক্যালিক্সের dilation দেখা যায়।
- Renogram (DTPA / MAG3): কিডনির কার্যকারিতা দেখা হয়।
- Serum creatinine: কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।
- Urine routine & culture: প্রস্রাবের সংক্রমণ আছে কিনা দেখা হয়।
এই পরীক্ষাগুলো চিকিৎসককে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে শিশুর কিডনিতে প্রস্রাব জমে ফুলে উঠেছে কিনা এবং কিডনির কার্যক্ষমতা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৫) জটিলতা (Complications)
Hydronephrosis চিকিৎসা না করলে বা দেরি হলে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।
- কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া
- বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ
- Hydronephrotic kidney — স্থায়ীভাবে ফুলে যাওয়া
- শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন কমে যাওয়া
তাই সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
৬) প্রতিরোধ (Prevention)
Hydronephrosis একটি জন্মগত বা অর্জিত সমস্যা, তাই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা ও সঠিক যত্নের মাধ্যমে জটিলতা এড়ানো যায়।
- গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি
- শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা
- প্রস্রাবে কোনো সমস্যা হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
- সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা করলে Hydronephrosis কোনো বড় সমস্যা তৈরি করে না।
৬) চিকিৎসা (Treatment)
Hydronephrosis-এর চিকিৎসা নির্ভর করে এর মাত্রা (mild, moderate, severe) এবং কারণের উপর। অনেক সময় হালকা Hydronephrosis নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তবে মাঝারি বা গুরুতর ক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
- Mild Hydronephrosis: সাধারণত পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে কিডনির আকার দেখা হয়।
- Moderate–Severe Hydronephrosis: চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়।
- সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
- শিশুকে পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো ও প্রস্রাবের প্রবাহ ঠিক রাখা জরুরি।
৭) সার্জারি (Surgery)
Hydronephrosis-এর definitive treatment হলো সার্জারি, তবে এটি সব ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় না। প্রায় ১৫–২৫% ক্ষেত্রে অপারেশন করতে হয়।
- PUJ obstruction: কিডনি ও মূত্রনালীর সংযোগস্থলে সংকোচন থাকলে Pyeloplasty অপারেশন করা হয়।
- Vesico-ureteric reflux (VUR): মূত্রনালীর পুনঃস্থাপন (Ureteric reimplantation) বা দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
- Posterior urethral valve (PUV): ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে cystoscopy মেশিনের মাধ্যমে প্রস্রাবের রাস্তার পর্দা কেটে দেওয়া হয়।
- Stone disease: মূত্রনালীর পাথর থাকলে endoscopic বা open surgery করে অপসারণ করা হয়।
অপারেশন সাধারণত জটিল নয় এবং ফলাফল ভালো হয়।
৮) ফলো‑আপ (Follow-up)
Hydronephrosis রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী ফলো‑আপ প্রয়োজন।
- নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে কিডনির আকার দেখা
- Renal scan করে কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন
- Serum creatinine পরীক্ষা করে কিডনির কার্যকারিতা দেখা
- শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন পর্যবেক্ষণ
ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে চিকিৎসার পর কিডনির কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক আছে এবং কোনো জটিলতা হয়নি।
৯) প্রগনোসিস (Prognosis)
Hydronephrosis-এর প্রগনোসিস নির্ভর করে এর কারণ, মাত্রা এবং চিকিৎসার সময়ের উপর।
- হালকা Hydronephrosis সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়।
- মাঝারি বা গুরুতর ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা করলে ফল ভালো হয়।
- অপারেশনের পর অধিকাংশ শিশুর কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করে।
তবে চিকিৎসা দেরি হলে কিডনির কার্যক্ষমতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
১০) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ (Advice for Parents)
অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। যদি প্রস্রাবের সমস্যা, সংক্রমণ বা পেট ফোলা দেখা যায়, তখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
- গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানো
- শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা
- সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
- অপারেশনের পর নিয়মিত ফলো‑আপ করানো
- শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া
শেষ কথাঃ (Conclusion)
Hydronephrosis হলো একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, যেখানে কিডনিতে প্রস্রাব জমে ফুলে ওঠে। এটি জন্মগত বা অর্জিত কারণে হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা ও ফলো‑আপ করলে শিশুর জীবন স্বাভাবিক হয় এবং ভবিষ্যতে কোনো বড় সমস্যা থাকে না। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464
