বাচ্চাদের হাইড্রোসিল (Hydrocele): ৭টি গুরুত্বপূর্ণ দিক — পরিচিতি, কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও পরামর্শ

হাইড্রোসিল হলো অণ্ডকোষের থলিতে (Scrotum) তরল জমে যাওয়ার কারণে অণ্ডকোষ ফুলে যাওয়া। এটি শিশুদের মধ্যে একটি সাধারণ সমস্যা, বিশেষ করে নবজাতকদের মধ্যে। সাধারণত এটি ব্যথাহীন ফোলা হিসেবে দেখা যায় এবং শিশুর দৈনন্দিন চলাফেরায় তেমন প্রভাব ফেলে না। তবে অভিভাবকদের কাছে এটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর এক বছরের বয়স হওয়ার আগেই হাইড্রোসিল নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে বড় হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

১) পরিচিতি

হাইড্রোসিল হলো অণ্ডকোষের চারপাশে তরল জমে থাকা। শিশুর জন্মের সময় অণ্ডকোষ পেট থেকে নিচে নেমে আসে এবং সেই সময় একটি ছোট পথ (Processus vaginalis) থাকে, যা সাধারণত জন্মের আগে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি এই পথ খোলা থেকে যায়, তবে পেটের ভেতরের তরল অণ্ডকোষের থলিতে প্রবেশ করে এবং হাইড্রোসিল তৈরি হয়। নবজাতকদের মধ্যে এটি খুব সাধারণ এবং সাধারণত ব্যথাহীন।

২) কারণ (Causes)

হাইড্রোসিলের প্রধান কারণ হলো জন্মগত সমস্যা। Processus vaginalis জন্মের আগে বন্ধ হয়ে না গেলে পেটের তরল অণ্ডকোষের থলিতে প্রবেশ করে। এটাই congenital hydrocele-এর মূল কারণ। তবে সবসময় জন্মগত নয়—কিছু ক্ষেত্রে পরবর্তীতে আঘাত, সংক্রমণ বা প্রদাহ থেকেও হাইড্রোসিল হতে পারে। বড় শিশুদের মধ্যে acquired hydrocele দেখা যায়, যা জন্মের সময় থাকে না কিন্তু পরবর্তীতে তৈরি হয়।

৩) লক্ষণ (Symptoms)

হাইড্রোসিল সাধারণত ব্যথাহীন ফোলা হিসেবে প্রকাশ পায়। অণ্ডকোষ বা স্ক্রোটাম ফুলে যায় এবং স্পর্শ করলে নরম ও মসৃণ লাগে। Communicating hydrocele হলে ফোলার আকার সকাল ও সন্ধ্যায় পরিবর্তিত হয়। Transillumination test-এ আলো দিলে ভেতরে আলো দেখা যায়, কারণ ভেতরে তরল থাকে। বড় হলে শিশুর হাঁটা বা বসায় অস্বস্তি হতে পারে।

৪) প্রকারভেদ (Types)

হাইড্রোসিলকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: জন্মগত (Congenital) এবং অর্জিত (Acquired)। জন্মগত হাইড্রোসিল আবার communicating, non-communicating এবং encysted hydrocele of cord এ বিভক্ত। Communicating hydrocele-এ তরল ওঠানামা করে, non-communicating hydrocele-এ তরল আটকে থাকে এবং encysted hydrocele of cord-এ অণ্ডকোষের উপরে ছোট বলের মতো ফোলা দেখা যায়। অর্জিত হাইড্রোসিল জন্মের সময় থাকে না, বরং পরবর্তীতে সংক্রমণ বা আঘাতের কারণে তৈরি হয়।

৫) চিকিৎসা (Treatment)

হাইড্রোসিলের চিকিৎসা নির্ভর করে শিশুর বয়স, হাইড্রোসিলের আকার এবং উপসর্গের ওপর। নবজাতক ও এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ হাইড্রোসিল নিজে থেকেই সেরে যায়। তাই এ সময় সাধারণত চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেন। তবে যদি হাইড্রোসিল বড় হয়, দীর্ঘস্থায়ী হয় বা শিশুর বয়স এক বছরের বেশি হয়, তাহলে সার্জারি প্রয়োজন হয়। সার্জারিতে ছোট ছিদ্র করে তরল জমার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি একটি নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি, যা শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করে।

  • Observation: এক বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে
  • Surgery: বড় বা দীর্ঘস্থায়ী হাইড্রোসিলে
  • Procedure: ছোট ছিদ্র করে তরল জমার পথ বন্ধ করা
  • Outcome: নিরাপদ ও কার্যকর, ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হয় না

৬) জটিলতা (Complications)

হাইড্রোসিল সাধারণত নিরীহ হলেও সময়মতো চিকিৎসা না করলে কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে। অণ্ডকোষের পাশে অতিরিক্ত তরল জমে অণ্ডকোষে চাপ পড়তে পারে, ফলে ব্যথা হয়। সংক্রমণ হলে প্রদাহ ও জ্বর দেখা দেয়। দীর্ঘস্থায়ী হাইড্রোসিলে অণ্ডকোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। তাই সময়মতো চিকিৎসা করা জরুরি।

  • চাপ: অণ্ডকোষে অতিরিক্ত তরল জমে চাপ পড়া
  • ব্যথা: দীর্ঘস্থায়ী ফোলায় অস্বস্তি
  • সংক্রমণ: প্রদাহ ও জ্বর
  • বৃদ্ধি ব্যাহত: অণ্ডকোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি কমে যাওয়া

৭) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ

শিশুর অণ্ডকোষ ফুলে গেলে অভিভাবকদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া। অনেক সময় এটি হাইড্রোসিল হয়, যা নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে যদি ফোলা বড় হয়, ব্যথা হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সার্জারি করতে হবে। অভিভাবকদের উচিত শিশুকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।

  • পর্যবেক্ষণ: নবজাতক ও ছোট শিশুর ক্ষেত্রে
  • চিকিৎসকের পরামর্শ: ফোলা বড় হলে বা ব্যথা হলে
  • সার্জারি: এক বছরের বেশি বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে
  • সচেতনতা: অভিভাবকদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি

অপারেশন সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর (FAQs)

অভিভাবকদের মনে অনেক প্রশ্ন থাকে অপারেশন নিয়ে। সাধারণত অপারেশন ছোট ছিদ্র করে করা হয় এবং কসমেটিক সেলাই দেওয়া হয়, তাই দাগ থাকে না। সেলাই কাটার প্রয়োজন হয় না। অপারেশনের পরদিন থেকেই শিশুর স্বাভাবিক চলাফেরা সম্ভব হয়। অপারেশন করতে সাধারণত ৩০–৪০ মিনিট সময় লাগে। ভবিষ্যতে শিশুর যৌন সমস্যা বা সন্তান ধারণে কোনো সমস্যা হয় না। অপারেশন করার সময় অজ্ঞান দেওয়া হয়, যা অভিজ্ঞ এনেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিরাপদভাবে করা হয়।

  • দাগ: থাকে না, কসমেটিক সেলাই দেওয়া হয়
  • সেলাই কাটার প্রয়োজন: নেই
  • চলাফেরা: অপারেশনের পরদিন থেকেই সম্ভব
  • সময়: ৩০–৪০ মিনিট
  • ভবিষ্যৎ সমস্যা: যৌন বা সন্তান ধারণে কোনো সমস্যা হয় না
  • অজ্ঞান: অভিজ্ঞ এনেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ

 শেষ কথাঃ

হাইড্রোসিল শিশুদের মধ্যে একটি সাধারণ সমস্যা, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে বড় বা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। সময়মতো চিকিৎসা করলে শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাভাবিক থাকে এবং কোনো জটিলতা হয় না। অভিভাবকদের উচিত শিশুর অণ্ডকোষে কোনো পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464