হার্শপ্রাং ডিজিজ (Hirschsprung Disease): নবজাতকের অন্ত্রের জন্মগত সমস্যা

হার্শপ্রাং ডিজিজ (Hirschsprung Disease): নবজাতকের অন্ত্রের জন্মগত সমস্যা

হার্শপ্রাং ডিজিজ হলো নবজাতক ও ছোট শিশুদের অন্ত্রের একটি জন্মগত রোগ। এতে বৃহদান্ত্রের (large intestine) একটি অংশে স্নায়ুকোষ (ganglion cells) অনুপস্থিত থাকে। ফলে ঐ অংশে স্বাভাবিক সংকোচন হয় না, মল সামনের দিকে এগোতে পারে না এবং কোষ্ঠকাঠিন্য বা অন্ত্রের ব্লকেজ হয়। এটি একটি গুরুতর congenital anomaly, যা শিশুর জীবন ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি-প্রক্রিয়ায় বড় প্রভাব ফেলে।                               

১) কারণ (Cause)

হার্শপ্রাং ডিজিজ হওয়ার প্রধান কারণ হলো গর্ভাবস্থায় শিশুর অন্ত্রের স্নায়ুকোষ পুরোপুরি বিকাশ না হওয়া। এছাড়া জেনেটিক কারণও থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি বংশগতভাবে দেখা যায়।

  • গর্ভাবস্থায় অন্ত্রের স্নায়ুকোষ বিকাশ না হওয়া
  • জেনেটিক বা বংশগত কারণ

২) প্রকারভেদ (Types)

হার্শপ্রাং ডিজিজ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ হলো short segment Hirschsprung disease, যেখানে কেবল rectum ও sigmoid colon অংশে স্নায়ুকোষ অনুপস্থিত থাকে। দীর্ঘ অংশে স্নায়ুকোষ অনুপস্থিত থাকলে তাকে long-segment Hirschsprung disease বলা হয়। বিরল ক্ষেত্রে পুরো বৃহদান্ত্র বা এমনকি পুরো অন্ত্র স্নায়ুহীন থাকতে পারে।

  • Short Segment Hirschsprung Disease: সবচেয়ে সাধারণ (৭৫–৮০%), rectum ও sigmoid colon আক্রান্ত।
  • Long Segment Hirschsprung Disease: স্নায়ুহীন অংশ sigmoid-এর ওপরেও চলে যায়।
  • Total Colonic Aganglionosis: পুরো colon স্নায়ুহীন।
  • Ultra-Short Segment: কেবল anus-এর কাছাকাছি ছোট অংশ আক্রান্ত।
  • Total Intestinal Aganglionosis (TIA): অত্যন্ত বিরল; পুরো ছোট ও বড় অন্ত্র স্নায়ুহীন।

৩) লক্ষণ (Symptoms)

লক্ষণ শিশুর বয়স অনুযায়ী ভিন্ন হয়। নবজাতকের ক্ষেত্রে জন্মের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মলত্যাগ না করা, পেট ফেঁপে থাকা, সবুজ বা পিত্তমিশ্রিত বমি এবং খাওয়ায় অনীহা দেখা যায়। বড় শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য, বারবার পেট ফোলা, ওজন না বাড়া এবং খাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।

  • নবজাতক: জন্মের ৪৮ ঘণ্টায় মলত্যাগ না করা
  • পেট ফেঁপে থাকা
  • সবুজ বা পিত্তমিশ্রিত বমি
  • খাওয়ায় অনীহা
  • বড় শিশু: দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য
  • বারবার পেট ফোলা
  • ওজন না বাড়া

৪) নির্ণয় (Diagnosis)

হার্শপ্রাং ডিজিজ নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হলো rectal biopsy। এতে দেখা হয় স্নায়ুকোষ আছে কিনা। Contrast enema X-ray-এ অন্ত্রের ব্লকেজের অংশ দেখা যায়। Anorectal manometry-তে rectum-এর পেশির সাড়া পরীক্ষা করা হয়।

  • Rectal biopsy – সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য
  • Contrast enema X-ray – ব্লকেজের অংশ দেখা যায়
  • Anorectal manometry – rectum-এর পেশির সাড়া পরীক্ষা

৫) চিকিৎসা (Treatment)

Hirschsprung Disease-এর definitive treatment হলো surgery। অন্ত্রের স্নায়ুহীন অংশ কেটে বাদ দিয়ে সুস্থ অংশকে পায়ুর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। নবজাতকের ক্ষেত্রে যদি পেট বেশি ফেঁপে যায়, তবে প্রথমে colostomy করা হয়, যাতে অন্ত্রের চাপ কমে এবং শিশুর অবস্থা স্থিতিশীল হয়। কয়েক মাস পর pull-through surgery করা হয়। বড় শিশুদের ক্ষেত্রে যদি স্নায়ুহীন অংশ ছোট হয়, তবে একধাপে surgery করা যায়। দীর্ঘ অংশ আক্রান্ত হলে staged surgery প্রয়োজন হয়।

  • Definitive treatment: Pull-through resection & colo-anal anastomosis
  • নবজাতক: প্রথমে colostomy, পরে pull-through surgery
  • বড় শিশু: ছোট অংশ আক্রান্ত হলে একধাপে surgery
  • দীর্ঘ অংশ আক্রান্ত হলে staged surgery

৬) অপারেশন (Surgery)

অপারেশন বিভিন্ন ধাপে করা যেতে পারে। নবজাতকের ক্ষেত্রে পেট বেশি ফেঁপে থাকলে প্রথমে colostomy করা হয়। কয়েক মাস পর স্নায়ুহীন অংশ কেটে বাদ দিয়ে সুস্থ অংশকে পায়ুর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বড় শিশুদের ক্ষেত্রে একধাপে pull-through surgery করা যায়। দীর্ঘ অংশ আক্রান্ত হলে তিন ধাপে surgery করা হয় — colostomy, definitive pull-through surgery এবং colostomy closure।

  • Colostomy: প্রথম ধাপ, অন্ত্রের চাপ কমাতে
  • Pull-through surgery: স্নায়ুহীন অংশ বাদ দিয়ে সুস্থ অংশকে পায়ুর সঙ্গে যুক্ত করা
  • Colostomy closure: শেষ ধাপ, স্বাভাবিক মলত্যাগ নিশ্চিত করা

৭) পরবর্তী যত্ন (Post-operative care)

অপারেশনের পর শিশুর দীর্ঘমেয়াদি যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। Anal dilator ব্যবহার করে পায়ুপথ ধীরে ধীরে প্রসারিত করতে হয়। শিশুর মলত্যাগের অভ্যাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। অনেক সময় constipation বা enterocolitis হতে পারে, তাই নিয়মিত follow-up জরুরি। খাদ্যাভ্যাসে প্রচুর পানি ও আঁশযুক্ত খাবার রাখতে হয়।

  • Anal dilator ব্যবহার
  • মলত্যাগের অভ্যাস ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়
  • Constipation বা enterocolitis হতে পারে
  • নিয়মিত follow-up জরুরি
  • খাদ্যাভ্যাসে পানি ও আঁশযুক্ত খাবার রাখা

৮) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ

অভিভাবকদের উচিত শিশুর মলত্যাগের সমস্যা লক্ষ্য করা। জন্মের পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মলত্যাগ না হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। Hirschsprung Disease ধরা পড়লে অভিজ্ঞ pediatric surgeon-এর কাছে চিকিৎসা করাতে হবে। অপারেশনের পর শিশুকে নিয়মিত follow-up করাতে হবে। অভিভাবকদের মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে এবং শিশুকে সমর্থন দিতে হবে।

  • জন্মের পর ৪৮ ঘণ্টায় মলত্যাগ না হলে চিকিৎসকের কাছে যান
  • অভিজ্ঞ pediatric surgeon-এর কাছে চিকিৎসা করান
  • অপারেশনের পর নিয়মিত follow-up করুন
  • শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দিন

৯) অপারেশন সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর (FAQs)

অভিভাবকদের মনে অনেক প্রশ্ন থাকে Hirschsprung Disease অপারেশন নিয়ে। সাধারণত ছোট অংশ আক্রান্ত হলে একধাপে surgery করা যায়। দীর্ঘ অংশ আক্রান্ত হলে staged surgery প্রয়োজন হয়। অপারেশনের সময় অজ্ঞান দেওয়া হয়, যা অভিজ্ঞ anesthetist-এর তত্ত্বাবধানে নিরাপদভাবে করা হয়। অপারেশনের পর শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদি follow-up জরুরি।

  • ছোট অংশ আক্রান্ত হলে একধাপে surgery
  • দীর্ঘ অংশ আক্রান্ত হলে staged surgery
  • অপারেশনের সময় অজ্ঞান নিরাপদভাবে দেওয়া হয়
  • অপারেশনের পর শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব
  • দীর্ঘমেয়াদি follow-up জরুরি

১০) শেষ কথাঃ

Hirschsprung Disease একটি গুরুতর congenital anomaly। সময়মতো চিকিৎসা করলে শিশুর জীবন স্বাভাবিক হতে পারে। অভিভাবকদের উচিত নবজাতকের মলত্যাগের সমস্যা লক্ষ্য করা এবং দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি follow-up শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464