গ্রোয়িং পেইন (Growing Pain): শিশুদের পায়ের ব্যথা — ৯টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

গ্রোয়িং পেইন হলো শিশুদের মধ্যে দেখা দেওয়া একটি সাধারণ ব্যথা, যা সাধারণত হাত-পা বা পায়ের পেশিতে হয়। নামটি “growing pain” হলেও এর সঙ্গে হাড়ের বৃদ্ধি সরাসরি সম্পর্ক নেই। এটি মূলত পেশি ও টেন্ডনের অস্বাভাবিক টান বা অতিরিক্ত ব্যবহারজনিত কারণে হয়। সাধারণত সন্ধ্যা বা রাতের দিকে ব্যথা বেশি হয় এবং সকালে উঠে ব্যথা থাকে না। এটি ভয়াবহ কোনো রোগ নয়, বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।

১) কারা বেশি আক্রান্ত হয় (Who are affected)

গ্রোয়িং পেইন সাধারণত ৩ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মধ্যে সামান্য বেশি দেখা যায়। যারা সারাদিন দৌড়ঝাঁপ করে, খেলাধুলা করে বা শারীরিকভাবে বেশি সক্রিয় থাকে, তাদের মধ্যে এই ব্যথা বেশি দেখা যায়।

  • ৩–১২ বছর বয়সী শিশু
  • মেয়েদের মধ্যে সামান্য বেশি
  • সক্রিয় ও খেলাধুলাপ্রিয় শিশুদের মধ্যে বেশি

২) লক্ষণ (Symptoms)

গ্রোয়িং পেইনের লক্ষণগুলো সহজেই চেনা যায়। এটি সাধারণত দুই পায়ের পেশিতে হয়। ব্যথা সন্ধ্যা বা রাতে বেড়ে যায়, কিন্তু সকালে উঠে ব্যথা থাকে না। কোনো ফোলা, লালচে ভাব বা গরমভাব থাকে না। শিশুটি ব্যথায় কান্নাকরতে পারে, তবে হাঁটতে কোনো সমস্যা হয় না।

  • দুই পায়ের পেশিতে ব্যথা
  • রাতে ব্যথা বেড়ে যায়
  • সকালে ব্যথা থাকে না
  • কোনো ফোলা, লালচে ভাব বা গরমভাব নেই
  • শিশু হাঁটতে পারে, শুধু ব্যথায় কান্না করে

৩) কারণ (Causes)

গ্রোয়িং পেইনের সঠিক কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে কিছু সম্ভাব্য কারণ হলো:

  • পেশি ও টেন্ডনের অতিরিক্ত ব্যবহার
  • সারাদিন দৌড়ঝাঁপ ও খেলাধুলা
  • শরীরের বৃদ্ধি ও হাড়ের সঙ্গে পেশির সামঞ্জস্যহীনতা
  • কিছু ক্ষেত্রে মানসিক চাপ বা ক্লান্তি

যদিও নামটি “growing pain”, আসলে এটি হাড়ের বৃদ্ধির কারণে হয় না। বরং পেশি ও টেন্ডনের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার কারণে হয়।

৪) রোগ নির্ণয় (Diagnosis)

গ্রোয়িং পেইন সাধারণত ক্লিনিক্যালি নির্ণয় করা হয়। চিকিৎসক শিশুর ইতিহাস শুনে এবং শারীরিক পরীক্ষা করে এটি শনাক্ত করেন। যেহেতু এতে কোনো ফোলা, লালচে ভাব বা গরমভাব থাকে না এবং সকালে ব্যথা থাকে না, তাই এটি সহজেই আলাদা করা যায়। তবে যদি ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয়, হাঁটতে সমস্যা হয় বা ফোলা দেখা যায়, তবে অন্য কোনো রোগ আছে কিনা তা পরীক্ষা করা জরুরি। এজন্য রক্ত পরীক্ষা বা এক্স-রে করা হতে পারে।

  • শিশুর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা
  • সকালে ব্যথা না থাকা
  • কোনো ফোলা বা লালচে ভাব না থাকা
  • প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা বা এক্স-রে

৫) প্রতিরোধ ও সচেতনতা (Prevention & Awareness)

গ্রোয়িং পেইন প্রতিরোধের নির্দিষ্ট কোনো উপায় নেই, কারণ এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে কিছু সচেতনতা শিশুকে আরাম দিতে পারে। যেমন:

  • শিশুকে অতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ বা খেলাধুলা থেকে বিরত রাখা
  • শোয়ার আগে হালকা স্ট্রেচিং ব্যায়াম করানো
  • শিশুকে আশ্বস্ত করা যে এটি ভয়াবহ কোনো রোগ নয়
  • সুষম খাদ্য ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা

অভিভাবকদের উচিত শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া এবং ব্যথা হলে হালকা মালিশ বা গরম সেঁক দেওয়া। এতে শিশুর আরাম হয় এবং ব্যথা কমে যায়।

৬) ব্যবস্থাপনা ও যত্ন (Management & Care)

গ্রোয়িং পেইন সাধারণত কোনো গুরুতর রোগ নয়, তাই চিকিৎসার চেয়ে যত্ন ও সঠিক ব্যবস্থাপনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর ব্যথা হলে হালকা মালিশ বা গরম সেঁক দিলে আরাম পাওয়া যায়। শোয়ার আগে পেশি স্ট্রেচিং ব্যায়াম করলে ব্যথা কমে। শিশুকে মানসিকভাবে আশ্বস্ত করা জরুরি, কারণ অনেক সময় ব্যথার কারণে তারা ভয় পায়।

  • হালকা মালিশ
  • গরম সেঁক
  • শোয়ার আগে স্ট্রেচিং ব্যায়াম
  • শিশুকে আশ্বস্ত করা

৭) চিকিৎসা (Treatment)

গ্রোয়িং পেইনের জন্য সাধারণত ওষুধের প্রয়োজন হয় না। তবে ব্যথা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে Paracetamol দেওয়া যেতে পারে। কোনো ফোলা, লালচে ভাব বা হাঁটতে সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, কারণ তখন অন্য কোনো রোগ থাকতে পারে।

  • সাধারণত ওষুধের প্রয়োজন নেই
  • ব্যথা বেশি হলে Paracetamol দেওয়া যেতে পারে
  • অস্বাভাবিক লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে

৮) পূর্বাভাস (Prognosis)

গ্রোয়িং পেইন ভয়াবহ কোনো রোগ নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। সাধারণত কৈশোরে পৌঁছালে এই ব্যথা আর থাকে না। শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও চলাফেরায় কোনো প্রভাব পড়ে না।

  • বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা কমে যায়
  • কৈশোরে পৌঁছালে সাধারণত আর থাকে না
  • শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও চলাফেরায় প্রভাব পড়ে না

৯) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ (Advice for Parents)

অভিভাবকদের উচিত শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া। শিশুকে বোঝাতে হবে যে এটি ভয়াবহ কোনো রোগ নয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভালো হয়ে যাবে। ব্যথা হলে হালকা মালিশ বা গরম সেঁক দিতে হবে। শোয়ার আগে স্ট্রেচিং ব্যায়াম করানো যেতে পারে। অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে যেন কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।

  • শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া
  • ব্যথা হলে মালিশ বা গরম সেঁক দেওয়া
  • শোয়ার আগে স্ট্রেচিং ব্যায়াম করানো
  • অস্বাভাবিক লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া

শেষ কথাঃ (Conclusion)

গ্রোয়িং পেইন হলো শিশুদের মধ্যে দেখা দেওয়া একটি সাধারণ ব্যথা, যা ভয়াবহ কোনো রোগ নয়। এটি সাধারণত রাতের দিকে হয় এবং সকালে উঠে থাকে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। অভিভাবকদের উচিত শিশুকে আশ্বস্ত করা, যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। সঠিক যত্ন ও সচেতনতার মাধ্যমে শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করা সম্ভব। 250464