পিত্তথলির পাথর (Gallstone): ৬টি গুরুত্বপূর্ণ দিক — পরিচিতি, কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও অভিভাবকদের পরামর্শ

পিত্তথলি (Gallbladder) হলো যকৃতের নিচে থাকা একটি ছোট থলি, যেখানে লিভার থেকে তৈরি হওয়া পিত্তরস (bile) জমা থাকে। এই পিত্তরস চর্বি হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন পিত্তরসে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন বা অন্যান্য পদার্থ জমে গিয়ে ক্রিস্টালের মতো জমাট বাঁধে, তখন তা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে পাথরের আকার নেয়—এগুলোই পিত্তথলির পাথর বা গলস্টোন। শিশুদের মধ্যে গলস্টোন তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও দেখা দিতে পারে এবং অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই উপস্থিত থাকে। তবে উপসর্গ দেখা দিলে তা শিশুর দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করতে পারে এবং চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

১) পরিচিতি

গলস্টোন হলো পিত্তথলিতে জমে থাকা কঠিন কণিকা, যা সাধারণত কোলেস্টেরল বা বিলিরুবিন থেকে তৈরি হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মধ্যে এটি কম দেখা যায়, তবে নির্দিষ্ট কিছু রোগ বা অবস্থার কারণে ঝুঁকি বেড়ে যায়। শিশুদের গলস্টোন অনেক সময় “silent stones” হিসেবে থাকে, অর্থাৎ কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকে এবং অন্য কারণে করা আল্ট্রাসাউন্ডে ধরা পড়ে। আবার অনেক সময় চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর হঠাৎ তীব্র ব্যথা, বমি বা জন্ডিস দেখা দেয়। গলস্টোন থাকলে পিত্তরসের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়, ফলে হজমে সমস্যা, সংক্রমণ এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভারের ক্ষতি হতে পারে।

  • প্রকৃতি: পিত্তরসে জমে থাকা কঠিন কণিকা
  • শিশুদের মধ্যে: তুলনামূলকভাবে বিরল, তবে ঝুঁকি থাকে
  • Silent stones: উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে

২) কারণ (Causes)

শিশুদের গলস্টোনের কারণ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কিছুটা আলাদা। রক্তের কিছু রোগ যেমন থ্যালাসেমিয়া বা সিকেল সেল অ্যানিমিয়া থাকলে রক্তকণিকা বেশি ভেঙে যায় এবং অতিরিক্ত বিলিরুবিন তৈরি হয়। এই বিলিরুবিন পিত্তে জমে গিয়ে পিগমেন্ট স্টোন তৈরি করে। জন্মগত পিত্তনালীর সমস্যা থাকলে পিত্তরসের প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং পাথর তৈরি হয়। স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন থাকলে পিত্তে কোলেস্টেরল জমে কোলেস্টেরল স্টোন তৈরি হয়। দীর্ঘদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকা বা শিরাপথে (IV) পুষ্টি দেওয়া হলে পিত্তথলি যথাসময়ে খালি না হয়ে পিত্ত জমে থাকে, ফলে স্লাজ বা পাথর তৈরি হতে পারে। এছাড়া পারিবারিক ইতিহাস থাকলে জেনেটিক কারণে ঝুঁকি বেড়ে যায়।

  • রক্তের রোগ: থ্যালাসেমিয়া, সিকেল সেল অ্যানিমিয়া
  • জন্মগত সমস্যা: পিত্তনালীর অস্বাভাবিকতা
  • স্থূলতা: অতিরিক্ত ওজন, কোলেস্টেরল জমে পাথর তৈরি
  • দীর্ঘ IV পুষ্টি: পিত্ত জমে গিয়ে স্লাজ/পাথর তৈরি
  • পারিবারিক ইতিহাস: জেনেটিক ঝুঁকি বৃদ্ধি

৩) লক্ষণ (Symptoms)

অনেক শিশুর ক্ষেত্রে গলস্টোন কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। তবে উপসর্গ দেখা দিলে তা সাধারণত চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর হঠাৎ তীব্র ব্যথা হিসেবে প্রকাশ পায়। এই ব্যথা ডান উপরের পেট বা মাঝখানে হয় এবং পিঠ বা ডান কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। ব্যথার সাথে বমিবমি ভাব ও বমি থাকতে পারে। পিত্তনালীতে পাথর আটকে গেলে জন্ডিস দেখা দেয়, যেখানে শিশুর চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যায়। মল ফ্যাকাশে হয় এবং মূত্র গাঢ় হয়। সংক্রমণ হলে জ্বর ও কাঁপুনি দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

  • তীব্র ব্যথা: ডান উপরের পেট বা মাঝখানে, চর্বিযুক্ত খাবারের পর
  • বমি: ব্যথার সাথে বমি ও অস্বস্তি
  • জন্ডিস: চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
  • ফ্যাকাশে মল: পিত্ত অন্ত্রে না পৌঁছালে
  • গাঢ় মূত্র: লিভারে পিত্ত জমে থাকার কারণে
  • জ্বর ও কাঁপুনি: সংক্রমণের ইঙ্গিত

৪) রোগনির্ণয় (Diagnosis)

শিশুদের পিত্তথলির পাথর নির্ণয়ের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হলো আল্ট্রাসনোগ্রাফি (Ultrasound)। এটি একটি নিরাপদ ও ব্যথাহীন পরীক্ষা, যেখানে পিত্তথলির ভেতরে পাথর আছে কিনা তা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। অনেক সময় অন্য কারণে করা আল্ট্রাসাউন্ডে গলস্টোন ধরা পড়ে। উপসর্গ থাকলে ডাক্তার সাধারণত রক্ত পরীক্ষা করে থাকেন, যেমন লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT), বিলিরুবিনের মাত্রা, সংক্রমণের উপস্থিতি ইত্যাদি। জটিলতা থাকলে বা পাথর পিত্তনালীতে চলে গেছে কিনা তা বোঝার জন্য উন্নত ইমেজিং পরীক্ষা যেমন MRCP (Magnetic Resonance Cholangiopancreatography) করা হতে পারে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় শিশুর গলস্টোন আছে কিনা এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা করা যায়।

  • আল্ট্রাসনোগ্রাফি: পিত্তথলির ভেতরে পাথর দেখা যায়
  • রক্ত পরীক্ষা: লিভার ফাংশন, বিলিরুবিন, সংক্রমণ নির্ণয়
  • MRCP: পিত্তনালীতে পাথর আছে কিনা তা নির্ণয়

৫) চিকিৎসা (Treatment)

শিশুদের গলস্টোনের চিকিৎসা নির্ভর করে উপসর্গ আছে কি না এবং কতবার হচ্ছে তার ওপর। যদি কোনো উপসর্গ না থাকে, তবে অনেক সময় চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না—শুধু নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। তবে যদি বারবার উপসর্গ দেখা দেয়, যেমন পেটব্যথা, বমি বা সংক্রমণ, তাহলে অস্ত্রোপচারই প্রধান চিকিৎসা। অস্ত্রোপচারে সাধারণত পাথরসহ পুরো পিত্তথলি অপসারণ করা হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে করা হয়, যেখানে ছোট ছোট ছিদ্র করে অপারেশন করা হয় এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। অস্ত্রোপচারের পর শিশুকে কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা হয় যাতে হজমে সমস্যা না হয়।

  • উপসর্গহীন: চিকিৎসা নয়, শুধু পর্যবেক্ষণ
  • উপসর্গযুক্ত: অস্ত্রোপচার করে পিত্তথলি অপসারণ
  • ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি: ছোট ছিদ্র করে নিরাপদ অপারেশন
  • পরবর্তী যত্ন: খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, নিয়মিত ফলো‑আপ

৬) জটিলতা (Complications)

গলস্টোন চিকিৎসা না করলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। পাথর পিত্তনালীতে আটকে গেলে পিত্তরস অন্ত্রে পৌঁছাতে পারে না, ফলে জন্ডিস হয়। সংক্রমণ হলে জ্বর, কাঁপুনি ও তীব্র ব্যথা দেখা দেয়, যা জরুরি চিকিৎসার বিষয়। দীর্ঘ সময় গলস্টোন থাকলে পিত্তথলির দেয়ালে প্রদাহ (Cholecystitis) হতে পারে, যা ব্যথা ও অস্বস্তি বাড়ায়। গুরুতর ক্ষেত্রে পিত্তথলি ফেটে যেতে পারে, যা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

  • জন্ডিস: পাথর পিত্তনালীতে আটকে গেলে
  • সংক্রমণ: জ্বর, কাঁপুনি, তীব্র ব্যথা
  • Cholecystitis: পিত্তথলির দেয়ালে প্রদাহ
  • ফেটে যাওয়া: গুরুতর জটিলতা, জীবনহানির ঝুঁকি

অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ

শিশুর গলস্টোন থাকলে অভিভাবকদের উচিত প্রতিটি লক্ষণ গুরুত্বের সাথে দেখা। যদি শিশুর বারবার পেটব্যথা, বমি, জন্ডিস বা জ্বর হয়, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। নিজে থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া বা চিকিৎসা বিলম্ব করা বিপজ্জনক হতে পারে। শিশুকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত করুন, চর্বিযুক্ত খাবার কম দিন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করান। নিয়মিত ফলো‑আপ করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করান। অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

  • ডাক্তার দেখান: অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত
  • নিজে চিকিৎসা নয়: ওষুধ বা বিলম্ব এড়িয়ে চলুন
  • খাদ্যাভ্যাস: স্বাস্থ্যকর খাবার, চর্বি কমানো
  • ফলো‑আপ: নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ

শেষ কথাঃ

পিত্তথলির পাথর শিশুদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না। অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে, তবে উপসর্গ দেখা দিলে তা গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা করলে শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রতিটি লক্ষণ গুরুত্বের সাথে দেখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। মনে রাখুন, পেটব্যথা, বমি বা জন্ডিস কখনো অবহেলা করবেন না। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান এবং নিয়মিত ফলো‑আপ করুন। 250464