১) ফরেন বডি ইনজেশন কী
ফরেন বডি ইনজেশন হলো খাবার নয় এমন কোনো বস্তু মুখ দিয়ে গিলে ফেলা। শিশুদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায় কারণ তারা কৌতূহলবশত বিভিন্ন জিনিস মুখে দেয়। অনেক সময় বস্তু খাদ্যনালীতে আটকে যায়, আবার অনেক সময় অন্ত্রে চলে যায়। কিছু বস্তু নিজে থেকেই বের হয়ে যায়, তবে কিছু বস্তু গুরুতর ক্ষতি করতে পারে।
২) কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে
সব শিশু সমানভাবে ঝুঁকিতে থাকে না। কিছু বিশেষ বয়স ও অবস্থার শিশুদের মধ্যে ফরেন বডি ইনজেশনের ঝুঁকি বেশি।
- ৬ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী শিশু।
- যাদের কৌতূহল বেশি।
- অটিজম বা মানসিক বিকাশে দেরি আছে এমন শিশু।
অতএব, অভিভাবকদের উচিত এই বয়সের শিশুদের বিশেষভাবে নজরে রাখা।
৩) সবচেয়ে সাধারণ বস্তুসমূহ
শিশুরা সাধারণত ছোট ও চকচকে বস্তু মুখে দেয়। এর মধ্যে কিছু বস্তু বিশেষভাবে বিপজ্জনক।
- কয়েন — সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
- ছোট খেলনার অংশ।
- বোতামের ব্যাটারি (Button battery)।
- সেফটি পিন, পেরেক, স্ক্রু।
- বীজ বা বাদাম।
এই বস্তুগুলো শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ এগুলো খাদ্যনালী বা অন্ত্রে আটকে যেতে পারে।
৪) খাদ্যনালীতে আটকালেঃ লক্ষণ
যদি বস্তু খাদ্যনালীতে আটকে যায়, তবে শিশুর মধ্যে কিছু স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়।
- গিলতে কষ্ট।
- লালা ঝরা।
- বমি বা বমিভাব।
- বুক ব্যথা।
- কাশি বা শ্বাস নিতে কষ্ট।
এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
৫) অন্ত্রে চলে গেলে লক্ষণ
যদি বস্তু অন্ত্রে চলে যায়, সাধারণত কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে যদি বস্তু আটকে যায় বা অন্ত্রে আঘাত দেয়, তখন কিছু গুরুতর লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
- পেট ব্যথা।
- বমি।
- রক্তমিশ্রিত মল।
অতএব, অন্ত্রে বস্তু চলে গেলে শিশুকে পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি।
৬) বিশেষভাবে বিপজ্জনক বস্তু
সব বস্তু সমানভাবে বিপজ্জনক নয়। কিছু বস্তু খুব দ্রুত গুরুতর ক্ষতি করতে পারে।
- Button battery: কয়েক ঘন্টার মধ্যে খাদ্যনালী পুড়িয়ে ছিদ্র করতে পারে (medical emergency)।
- Sharp object: যেমন পিন বা সূঁচ — খাদ্যনালী বা অন্ত্রে ছিদ্র করতে পারে।
- Magnet: একাধিক হলে অন্ত্রে আটকে গিয়ে necrosis বা ছিদ্র করতে পারে।
এই বস্তুগুলো শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
৭) পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Investigations)
শিশু কোনো বস্তু গিলে ফেলেছে সন্দেহ হলে দ্রুত পরীক্ষা করা জরুরি। পরীক্ষার মাধ্যমে বস্তু কোথায় আটকে আছে এবং কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে তা বোঝা যায়।
- X-ray: ধাতব বস্তু যেমন কয়েন, ব্যাটারি, পিন ইত্যাদি শনাক্ত করতে সবচেয়ে কার্যকর।
- Ultrasound: নরম বস্তু বা বীজ শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
- Endoscopy: খাদ্যনালী বা পাকস্থলীতে আটকে থাকা বস্তু দেখা ও বের করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
- CT Scan: জটিল ক্ষেত্রে অন্ত্রে ছিদ্র বা ক্ষতি হয়েছে কিনা তা বোঝার জন্য।
সঠিক পরীক্ষা চিকিৎসককে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
৮) চিকিৎসা (Management)
চিকিৎসা নির্ভর করে বস্তু কী ধরনের, কোথায় আটকে আছে এবং শিশুর উপসর্গের উপর।
- Observation: যদি বস্তু ছোট, মসৃণ এবং অন্ত্রে চলে যায় তবে ২৪–৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রতিদিন মল পরীক্ষা করে দেখা হয় বস্তু বের হয়েছে কিনা।
- Endoscopic removal: খাদ্যনালী বা পাকস্থলীতে আটকে থাকা বস্তু এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে বের করা হয়। বিশেষ করে Button battery বা ধারালো বস্তু হলে দ্রুত অপসারণ জরুরি।
- Surgical removal: যদি বস্তু অন্ত্রে ছিদ্র বা বাধা সৃষ্টি করে তবে অপারেশনের মাধ্যমে বের করতে হয়।
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো বস্তু দ্রুত বের করা এবং শিশুর জীবন বাঁচানো।
৯) বিশেষ জরুরি অবস্থা
কিছু বস্তু শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
- Button battery: কয়েক ঘন্টার মধ্যে খাদ্যনালী পুড়িয়ে ছিদ্র করতে পারে। এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি।
- Sharp object: খাদ্যনালী বা অন্ত্রে ছিদ্র করতে পারে।
- Multiple magnets: অন্ত্রে আটকে গিয়ে necrosis বা ছিদ্র করতে পারে।
এই বস্তুগুলো গিলে ফেললে শিশুকে অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হবে।
১০) ফলো‑আপ (Follow-up)
চিকিৎসার পর শিশুকে নিয়মিত ফলো‑আপে রাখতে হয়। কারণ বস্তু বের হওয়ার পরও অন্ত্রে ক্ষতি থাকতে পারে।
- নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা।
- প্রয়োজনে পুনরায় X-ray বা Endoscopy।
- শিশুর খাওয়ার অভ্যাস ও আচরণ পর্যবেক্ষণ।
ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় যে শিশুর শরীরে কোনো জটিলতা হয়নি।
১১) প্রগনোসিস (Prognosis)
শিশুদের ফরেন বডি ইনজেশনের প্রগনোসিস নির্ভর করে বস্তু কী ধরনের এবং কত দ্রুত চিকিৎসা করা হয়েছে তার উপর।
- ছোট ও মসৃণ বস্তু — সাধারণত নিজে থেকেই বের হয়ে যায়।
- Button battery বা ধারালো বস্তু — জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
- সঠিক সময়ে চিকিৎসা করলে শিশুরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।
তবে দেরি হলে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুদের ফরেন বডি ইনজেশন প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
- শিশুর নাগালের বাইরে ছোট বস্তু রাখুন।
- খেলনা কিনতে গেলে বয়স উপযোগী খেলনা দিন।
- শিশুকে খাওয়ার সময় নজরে রাখুন।
- শিশু কোনো বস্তু গিলে ফেললে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর জীবন বাঁচাতে এবং ভবিষ্যতের জটিলতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
শেষ কথাঃ (Conclusion)
ফরেন বডি ইনজেশন শিশুদের মধ্যে একটি সাধারণ সমস্যা হলেও সময়মতো চিকিৎসা করলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ, এন্ডোস্কোপি বা সার্জারির মাধ্যমে বস্তু বের করা যায়। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464
