এপিডিডাইমো-অর্কাইটিস (Epididymo-orchitis): ৬টি গুরুত্বপূর্ণ দিক — পরিচিতি, কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও পরামর্শ

অণ্ডথলি (স্ক্রোটাম) ফুলে যাওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এপিডিডাইমো-অর্কাইটিস এবং টরশন টেস্টিস অন্যতম। অণ্ডকোষের উপরে থাকা একটি নালী, যেখানে স্পার্ম তৈরি হওয়ার পর জমে থাকে, সেটিকে এপিডিডাইমিস বলা হয়। অণ্ডকোষের প্রদাহকে বলা হয় অর্কাইটিস। যখন এপিডিডাইমিস এবং অণ্ডকোষ উভয়ই প্রদাহিত হয়, তখন তাকে এপিডিডাইমো-অর্কাইটিস বলা হয়। এটি শিশু ও কিশোরদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করলে গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।

১) পরিচিতি

এপিডিডাইমো-অর্কাইটিস হলো অণ্ডকোষ ও এপিডিডাইমিসের প্রদাহজনিত একটি অবস্থা। সাধারণত এটি সংক্রমণের কারণে হয়, তবে কখনো কখনো ভাইরাস বা যৌনবাহিত রোগের কারণেও হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও কিশোরদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। স্ক্রোটাম ফুলে যাওয়া, ব্যথা, লালচে ভাব এবং জ্বর এর প্রধান লক্ষণ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করলে অণ্ডকোষের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

  • প্রকৃতি: অণ্ডকোষ ও এপিডিডাইমিসের প্রদাহ
  • প্রভাব: স্ক্রোটাম ফুলে যাওয়া, ব্যথা, অস্বস্তি
  • ঝুঁকি: চিকিৎসা না করলে স্থায়ী ক্ষতি

২) কারণ (Causes)

এপিডিডাইমো-অর্কাইটিসের প্রধান কারণ হলো সংক্রমণ। সাধারণত ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) বা কিডনি/মূত্রনালীর সংক্রমণ থেকে এটি ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ভাইরাল সংক্রমণ, বিশেষ করে মাম্পস, কিশোরদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। যৌনভাবে সক্রিয় কিশোরদের ক্ষেত্রে যৌনবাহিত রোগ (STD) থেকেও এপিডিডাইমো-অর্কাইটিস হতে পারে।

  • UTI: কিডনি বা মূত্রনালীর সংক্রমণ
  • ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ: সবচেয়ে সাধারণ কারণ
  • ভাইরাল সংক্রমণ: মাম্পস
  • STD: যৌনভাবে সক্রিয় কিশোরদের মধ্যে

৩) লক্ষণ ও চিহ্ন (Symptoms & Signs)

এপিডিডাইমো-অর্কাইটিসের লক্ষণ সাধারণত হঠাৎ শুরু হয়। স্ক্রোটামের ব্যথা সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ, যা একপাশে বেশি হলেও কখনো দুই পাশেও হতে পারে। স্ক্রোটাম ফুলে যায় এবং লাল হয়ে যায়। তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং অনেক সময় জ্বর ও বমি দেখা দেয়। কিশোরদের ক্ষেত্রে প্রদাহজনিত অস্বস্তি বেশি হয় এবং অণ্ডকোষ লালচে হয়ে যায়। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ টরশন টেস্টিসের মতো জরুরি অবস্থার সাথে এটি বিভ্রান্ত হতে পারে।

  • ব্যথা: হঠাৎ স্ক্রোটামে ব্যথা
  • ফোলা: স্ক্রোটাম ফুলে যাওয়া
  • লালচে ভাব: প্রদাহের কারণে
  • জ্বর: সংক্রমণ হলে
  • বমি: তীব্র অস্বস্তির কারণে
  • কিশোরদের ক্ষেত্রে: লালচে অণ্ডকোষ ও অস্বস্তি

৪) রোগনির্ণয় (Diagnosis)

এপিডিডাইমো-অর্কাইটিস নির্ণয়ের জন্য প্রথমে রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। স্ক্রোটাম ফুলে যাওয়া, ব্যথা ও লালচে ভাব থাকলে ডাক্তার সাধারণত আল্ট্রাসাউন্ড (Scrotal Doppler) করেন। এতে রক্তসঞ্চালন দেখা যায়—যদি টরশন টেস্টিস থাকে তবে রক্ত সরবরাহ কমে যায়, আর প্রদাহ থাকলে রক্তসঞ্চালন বেড়ে যায়। প্রস্রাব পরীক্ষা ও কালচার করে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়। রক্ত পরীক্ষায় সংক্রমণের মাত্রা বোঝা যায়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় এটি এপিডিডাইমো-অর্কাইটিস নাকি অন্য কোনো জরুরি অবস্থা।

  • Scrotal Doppler: রক্তসঞ্চালন দেখা
  • প্রস্রাব পরীক্ষা: ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ শনাক্ত
  • রক্ত পরীক্ষা: সংক্রমণের মাত্রা নির্ণয়

৫) চিকিৎসা (Treatment)

চিকিৎসা নির্ভর করে সংক্রমণের ধরন ও রোগীর অবস্থার ওপর। সাধারণত বিশ্রাম, এন্টিবায়োটিক, প্যারাসিটামল এবং এন্টিহিস্টামিন দেওয়া হয়। এন্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করে, প্যারাসিটামল ব্যথা ও জ্বর কমায়, আর এন্টিহিস্টামিন প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হয় এবং স্ক্রোটামকে সাপোর্ট দিতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। ভাইরাল সংক্রমণের ক্ষেত্রে সাপোর্টিভ চিকিৎসাই যথেষ্ট।

  • বিশ্রাম: শারীরিক চাপ কমানো
  • এন্টিবায়োটিক: ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ
  • প্যারাসিটামল: ব্যথা ও জ্বর কমানো
  • এন্টিহিস্টামিন: প্রদাহ কমানো

৬) জরুরি সতর্কতা (Emergency Alert)

এপিডিডাইমো-অর্কাইটিস অনেক সময় টরশন টেস্টিসের সাথে বিভ্রান্ত হতে পারে। টরশন টেস্টিসে অণ্ডকোষের রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ৬–৮ ঘণ্টার মধ্যে সার্জারি না করলে অণ্ডকোষ স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই হঠাৎ তীব্র ব্যথা ও ফোলা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। চিকিৎসক আল্ট্রাসাউন্ড করে নিশ্চিত করেন এটি প্রদাহ নাকি টরশন। অভিভাবকদের উচিত এসব লক্ষণকে অবহেলা না করা।

  • হঠাৎ তীব্র ব্যথা: টরশন টেস্টিস হতে পারে
  • ৬–৮ ঘণ্টার মধ্যে সার্জারি: দেরি হলে অণ্ডকোষ নষ্ট
  • দ্রুত হাসপাতালে যান: জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন

অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ

শিশুর স্ক্রোটাম ফুলে গেলে বা ব্যথা হলে অভিভাবকদের উচিত দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া। নিজে থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া বা চিকিৎসা বিলম্ব করা বিপজ্জনক হতে পারে। শিশুকে বিশ্রামে রাখুন, পর্যাপ্ত পানি পান করান এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য দিন। নিয়মিত ফলো‑আপ করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করান। অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

  • ডাক্তার দেখান: অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত
  • নিজে চিকিৎসা নয়: ওষুধ বা বিলম্ব এড়িয়ে চলুন
  • খাদ্যাভ্যাস: স্বাস্থ্যকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি
  • ফলো‑আপ: নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ

শেষ কথাঃ

এপিডিডাইমো-অর্কাইটিস হলো অণ্ডকোষ ও এপিডিডাইমিসের প্রদাহজনিত একটি অবস্থা, যা সাধারণত সংক্রমণের কারণে হয়। সময়মতো চিকিৎসা করলে এটি সেরে যায়, তবে টরশন টেস্টিসের মতো জরুরি অবস্থার সাথে বিভ্রান্ত হতে পারে। তাই হঠাৎ তীব্র ব্যথা বা ফোলা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464