ডুপ্লেক্স কিডনি (Duplex Kidney): জন্মগতভাবে অতিরিক্ত ইউরেটার — ৯টি গুরুত্বপূর্ণ দিক
ডুপ্লেক্স কিডনি একটি জন্মগত অস্বাভাবিকতা। অনেক সময় এটি কোনো লক্ষণ ছাড়াই থেকে যায় এবং অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে ধরা পড়ে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি মূত্রনালীর সংক্রমণ, প্রস্রাবের সমস্যা বা কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
১) ডুপ্লেক্স কিডনি কী
ডুপ্লেক্স কিডনি হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে একটি কিডনির মধ্যে দুটি ইউরেটার থাকে। এটি সম্পূর্ণ বা আংশিক হতে পারে।
- সম্পূর্ণ ডুপ্লেক্স কিডনি: দুটি ইউরেটার আলাদা আলাদা ভাবে মূত্রথলীতে প্রবেশ করে।
- অসম্পূর্ণ ডুপ্লেক্স কিডনি: দুটি ইউরেটার শুরুতে আলাদা থাকলেও পরে একসাথে মিলে মূত্রথলীতে প্রবেশ করে।
এই অবস্থাকে অনেক সময় "Duplicated Ureter" বলা হয়। এটি একটি জন্মগত anomaly, অর্থাৎ জন্ম থেকেই থাকে।
২) কারণ (Cause)
ডুপ্লেক্স কিডনি একটি congenital anomaly। ভ্রূণ অবস্থায় কিডনি ও ইউরেটার গঠনের সময় অতিরিক্ত ইউরেটার তৈরি হলে এই সমস্যা হয়।
- ভ্রূণ অবস্থায় কিডনির বিকাশে অস্বাভাবিকতা
- জেনেটিক বা বংশগত কারণ
- অজানা পরিবেশগত প্রভাব
এটি কোনো বাহ্যিক কারণে হয় না, বরং ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশে ব্যর্থতার কারণে ঘটে।
৩) লক্ষণ (Symptoms)
ডুপ্লেক্স কিডনি অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই থেকে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
- ঘনঘন প্রস্রাবের সংক্রমণ (Urinary tract infection)
- প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা দুর্গন্ধ
- কোমর বা পেটে ব্যথা
- প্রস্রাব আটকে থাকা
- প্রস্রাবে রক্ত আসা
- শিশুদের ক্ষেত্রে প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে সমস্যা (incontinence)
এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৪) ডায়াগনসিস (Diagnosis)
ডুপ্লেক্স কিডনি নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।
- Ultrasound: কিডনির গঠন দেখা যায়।
- MCUG (Micturating Cystourethrogram): মূত্রথলীর কার্যকারিতা দেখা যায়।
- CT Scan বা MRI Urography: ইউরেটারের গঠন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
- DMSA Scan: কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।
এই পরীক্ষাগুলো চিকিৎসককে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে শিশুর বা রোগীর ডুপ্লেক্স কিডনি আছে কিনা এবং কিডনির কার্যক্ষমতা কতটা স্বাভাবিক।
৫) জটিলতা (Complications)
ডুপ্লেক্স কিডনি সাধারণত বিপজ্জনক নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
- বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ
- কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া
- প্রস্রাব আটকে থাকা
- Hydronephrosis (কিডনিতে পানি জমা)
- শিশুদের ক্ষেত্রে প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণে সমস্যা
এই জটিলতাগুলো এড়াতে অভিভাবকদের সচেতন থাকা জরুরি।
৬) প্রতিরোধ (Prevention)
ডুপ্লেক্স কিডনি একটি জন্মগত সমস্যা, তাই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা ও সঠিক যত্নের মাধ্যমে জটিলতা এড়ানো যায়।
- শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা
- প্রস্রাবে কোনো সমস্যা হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
- সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
- নিয়মিত ফলো‑আপ করা
অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা করলে ডুপ্লেক্স কিডনি কোনো বড় সমস্যা তৈরি করে না।
৬) চিকিৎসা (Treatment)
ডুপ্লেক্স কিডনি সাধারণত বিপজ্জনক নয় এবং অনেক সময় কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। যদি কোনো উপসর্গ না থাকে, তবে শুধু পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। তবে যদি বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ হয়, কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায় বা প্রস্রাব আটকে থাকে, তখন চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
- অ্যান্টিবায়োটিক — বারবার সংক্রমণ হলে
- ব্যথা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ
- প্রস্রাবের প্রবাহ ঠিক রাখতে চিকিৎসা
- শিশুদের ক্ষেত্রে incontinence নিয়ন্ত্রণে বিশেষ যত্ন
চিকিৎসার ধরন নির্ভর করে রোগীর বয়স, উপসর্গ এবং কিডনির কার্যক্ষমতার উপর।
৭) সার্জারি (Surgery)
ডুপ্লেক্স কিডনির ক্ষেত্রে সাধারণত সার্জারি প্রয়োজন হয় না। তবে গুরুতর জটিলতা থাকলে সার্জারি করা হয়।
- Ureteric reimplantation: ইউরেটারকে সঠিকভাবে মূত্রথলীতে সংযুক্ত করা হয়।
- Partial nephrectomy: কিডনির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ অপসারণ করা হয়।
- Endoscopic surgery: আধুনিক minimally invasive surgery, যেখানে ছোট ছিদ্র দিয়ে অপারেশন করা হয়।
সার্জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখনই, যখন কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায় বা বারবার সংক্রমণ হয়।
৮) ফলো‑আপ (Follow-up)
ডুপ্লেক্স কিডনি রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী ফলো‑আপ প্রয়োজন।
- নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে কিডনির গঠন দেখা
- প্রস্রাবের পরীক্ষা করে সংক্রমণ আছে কিনা দেখা
- শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন পর্যবেক্ষণ
- কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন
ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে রোগীর কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে এবং কোনো জটিলতা হয়নি।
৯) প্রগনোসিস (Prognosis)
ডুপ্লেক্স কিডনির প্রগনোসিস সাধারণত ভালো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।
- উপসর্গ না থাকলে শুধু পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট
- বারবার সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
- গুরুতর জটিলতা হলে সার্জারি প্রয়োজন
সঠিক সময়ে চিকিৎসা করলে রোগীর জীবন স্বাভাবিক হয় এবং ভবিষ্যতে কোনো বড় সমস্যা থাকে না।
১০) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ (Advice for Parents)
অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। যদি বারবার সংক্রমণ হয় বা প্রস্রাবে সমস্যা দেখা দেয়, তখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
- শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা
- প্রস্রাবে জ্বালা বা দুর্গন্ধ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
- নিয়মিত ফলো‑আপ করানো
- শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া
শেষ কথাঃ (Conclusion)
ডুপ্লেক্স কিডনি হলো একটি জন্মগত সমস্যা, যেখানে একটি কিডনির মধ্যে দুটি ইউরেটার থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি বিপজ্জনক নয় এবং কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে বারবার সংক্রমণ হলে বা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। সময়মতো চিকিৎসা ও অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464
