ক্লাবফুট (Clubfoot): জন্মগত পা বাঁকা — ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

ক্লাবফুট (Clubfoot): জন্মগত পা বাঁকা — ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

ক্লাবফুট বা Congenital Talipes Equinovarus (CTEV) হলো নবজাতকের একটি জন্মগত বিকৃতি, যেখানে শিশুর এক বা দুইটি পা অস্বাভাবিকভাবে ভেতরের দিকে ও নিচের দিকে বাঁকানো থাকে। এটি নবজাতকের মধ্যে অন্যতম সাধারণ জন্মগত অস্থি ও পেশি সমস্যা। বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০০০ নবজাতকের মধ্যে প্রায় ১ জনের ক্লাবফুট দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে অধিকাংশ শিশুর পা সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।

১) ক্লাবফুটের ধরন (Types of Clubfoot)

ক্লাবফুটকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:

  • Congenital (জন্মগত): জন্মের সময় থেকেই থাকে। এটি সবচেয়ে সাধারণ ধরন।
  • Acquired (অর্জিত): জন্মের পর কোনো আঘাত বা রোগের কারণে হতে পারে। এটি খুবই বিরল।

Congenital clubfoot সাধারণত ভ্রূণের বিকাশজনিত ত্রুটি বা জেনেটিক কারণে হয়। Acquired clubfoot হতে পারে স্নায়ু বা পেশির রোগের কারণে, তবে এর হার খুবই কম।

২) লক্ষণ (Symptoms)

ক্লাবফুটের লক্ষণ জন্মের সময়ই স্পষ্টভাবে দেখা যায়। শিশুর পা অস্বাভাবিকভাবে বাঁকানো থাকে। প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

  • পা নিচের দিকে বাঁকানো (Equinus deformity)
  • পা ভেতরের দিকে মোড়ানো (Varus deformity)
  • পায়ের তলার ভাঁজ অস্বাভাবিকভাবে উঁচু
  • গোড়ালি ছোট বা শক্ত লাগে
  • শিশু হাঁটতে শিখলে পায়ের পাশ দিয়ে ভর দিয়ে হাঁটে

এই লক্ষণগুলো শিশুর চলাফেরায় সমস্যা তৈরি করে। চিকিৎসা না করলে শিশুর হাঁটা, দৌড়ানো ও খেলাধুলা করার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়।

৩) কারণ (Causes)

ক্লাবফুট হওয়ার কারণগুলো বিভিন্ন হতে পারে। প্রধান কারণগুলো হলো:

  • জেনেটিক কারণ: পরিবারে থাকলে ঝুঁকি বেশি।
  • গর্ভাবস্থায় অবস্থানগত কারণ: ভ্রূণের অবস্থানজনিত কারণে পায়ে চাপ পড়া।
  • স্নায়ু ও পেশির সমস্যা: যেমন স্পাইনা বাইফিডা বা নিউরোমাসকুলার রোগ।

এছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্য সমস্যা, পুষ্টির অভাব বা পরিবেশগত কারণেও ক্লাবফুট হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি জন্মগত এবং নির্দিষ্ট কোনো কারণ পাওয়া যায় না।

৪) প্রাথমিক চিকিৎসার গুরুত্ব (Importance of Early Treatment)

ক্লাবফুটের চিকিৎসা যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যায়, ততই ভালো ফল পাওয়া যায়। জন্মের পরপরই চিকিৎসা শুরু করলে শিশুর পা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। চিকিৎসা দেরি হলে পায়ের হাড় ও পেশি শক্ত হয়ে যায়, ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে।

প্রাথমিক চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুর হাঁটা, দৌড়ানো ও খেলাধুলা করার ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখা যায়। এজন্য জন্মের পরপরই শিশুকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া জরুরি।

  • জন্মের পরপরই চিকিৎসা শুরু করা উচিত
  • দেরি হলে হাড় ও পেশি শক্ত হয়ে যায়
  • প্রাথমিক চিকিৎসায় শিশুর স্বাভাবিক চলাফেরা সম্ভব

৫) Ponseti Method (সবচেয়ে জনপ্রিয় চিকিৎসা)

Ponseti Method হলো ক্লাবফুটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি। এটি জন্মের পরপরই (৭–১০ দিন পর) শুরু করা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রতিসপ্তাহে প্লাস্টার পরিবর্তন করে ধীরে ধীরে শিশুর পা সঠিক অবস্থায় আনা হয়। সাধারণত ৫–৭ বার প্লাস্টার পরিবর্তন করতে হয়।

শেষে একটি ছোট অস্ত্রোপচার (Tenotomy) করা হয়, যেখানে গোড়ালির টান (Achilles tendon) কেটে সামান্য লম্বা করা হয়। এটি খুবই ছোট একটি সার্জারি এবং স্থানীয় অ্যানেস্থেশিয়ায় করা হয়। সার্জারির পর আবার একটি ফাইনাল প্লাস্টার দেওয়া হয়, যা প্রায় ৩ সপ্তাহ থাকে।

পা সোজা হয়ে গেলে deformity পুনরায় ফিরে আসা ঠেকাতে Ponseti brace ব্যবহার করতে হয়। এই ব্রেসে দুটি ছোট জুতা থাকে, যা একটি বার (bar)-এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। প্রথম ৩ মাস দিনে ২৩ ঘণ্টা পরতে হয়, এরপর ২–৪ বছর পর্যন্ত শুধু ঘুমের সময় পরতে হয়।

  • প্রতিসপ্তাহে প্লাস্টার পরিবর্তন করে পা সোজা করা হয়
  • ৫–৭ বার প্লাস্টার পরিবর্তন প্রয়োজন
  • ছোট অস্ত্রোপচার (Tenotomy) করা হয়
  • Ponseti brace deformity পুনরায় আসা ঠেকায়

৬) ফিজিওথেরাপি (Physiotherapy)

Ponseti পদ্ধতির পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি ক্লাবফুট চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে শিশুর পায়ের মুভমেন্ট বাড়ানো হয় এবং পেশি শক্তিশালী করা হয়। নিয়মিত ব্যায়াম শিশুর পা সঠিক অবস্থায় রাখতে সাহায্য করে। ফিজিওথেরাপি বিশেষ করে সেইসব ক্ষেত্রে কার্যকর, যেখানে deformity আংশিকভাবে সংশোধিত হয়েছে বা পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি আছে।

  • পায়ের মুভমেন্ট বাড়ানো
  • পেশি শক্তিশালী করা
  • পা সঠিক অবস্থায় রাখা
  • পুনরায় deformity আসা ঠেকানো

৭) অস্ত্রোপচার (Surgery)

যদি প্রাথমিক চিকিৎসা (Ponseti Method ও ফিজিওথেরাপি) কাজ না করে, তবে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। অস্ত্রোপচারে টেন্ডন, লিগামেন্ট বা হাড় সংশোধন করা হয়। সবচেয়ে সাধারণ সার্জারি হলো Achilles tendon lengthening বা অন্যান্য soft tissue release। গুরুতর deformity থাকলে হাড়ের অবস্থান পরিবর্তন করতে osteotomy করা হয়।

অস্ত্রোপচার সাধারণত তখনই করা হয় যখন শিশুর বয়স কিছুটা বেড়ে যায় এবং প্রাথমিক চিকিৎসায় ফল পাওয়া যায়নি। তবে আধুনিক চিকিৎসায় Ponseti Method-এর কারণে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন অনেক কমে গেছে।

  • Achilles tendon lengthening
  • Soft tissue release
  • Osteotomy (হাড় সংশোধন)
  • প্রাথমিক চিকিৎসায় ফল না এলে অস্ত্রোপচার

৮) চিকিৎসার সময়কাল (Duration of Treatment)

ক্লাবফুট চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। Ponseti Method সাধারণত ৩–৪ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়। তবে deformity পুনরায় ফিরে আসা ঠেকাতে শিশুকে ৩–৪ বছর পর্যন্ত রাতে Ponseti brace পরতে হয়।

চিকিৎসার সময়কাল নির্ভর করে deformity-এর তীব্রতা, শিশুর বয়স এবং চিকিৎসা শুরু করার সময়ের উপর। যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা যায়, তত দ্রুত ফল পাওয়া যায়।

  • Ponseti Method: ৩–৪ মাস
  • Brace ব্যবহার: ৩–৪ বছর পর্যন্ত রাতে
  • চিকিৎসার সময়কাল deformity-এর তীব্রতার উপর নির্ভর করে

৯) পূর্বাভাস (Prognosis)

সঠিক চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ শিশুর পা সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। তারা দৌড়াতে, খেলতে ও সাধারণভাবে হাঁটতে পারে। Ponseti Method-এর সাফল্যের হার অত্যন্ত বেশি (প্রায় ৮৫–৯০%)।

তবে চিকিৎসা দেরি হলে deformity স্থায়ী হয়ে যেতে পারে এবং শিশুর হাঁটার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়। এজন্য জন্মের পরপরই চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।

  • সঠিক চিকিৎসায় শিশুর পা স্বাভাবিক হয়
  • Ponseti Method-এর সাফল্যের হার ৮৫–৯০%
  • দেরি হলে deformity স্থায়ী হয়ে যেতে পারে

১০) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ (Advice for Parents)

অভিভাবকদের উচিত শিশুর চিকিৎসা শুরু করার পর নিয়মিত ফলো‑আপ করানো। Ponseti brace সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। শিশুর পায়ের অবস্থান ও মুভমেন্ট নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

অভিভাবকদের মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে এবং শিশুকে সমর্থন দিতে হবে। চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চললে শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।

  • নিয়মিত ফলো‑আপ করানো
  • Ponseti brace সঠিকভাবে ব্যবহার করা
  • শিশুর পায়ের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা
  • চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা

শেষ কথাঃ (Conclusion)

ক্লাবফুট বা Congenital Talipes Equinovarus (CTEV) হলো নবজাতকের একটি সাধারণ জন্মগত বিকৃতি। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে অধিকাংশ শিশুর পা সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। Ponseti Method হলো সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা, যা deformity সংশোধন করে এবং পুনরায় ফিরে আসা ঠেকায়। অভিভাবকদের সচেতনতা, চিকিৎসকের দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলো‑আপের মাধ্যমে শিশুর ভবিষ্যৎ উন্নত করা সম্ভব।