১) সম্ভাব্য কারণ
শিশুদের পেটে আঘাত হওয়ার প্রধান কারণ হলো রাস্তা দুর্ঘটনা। তবে অন্যান্য কারণও থাকতে পারে।
- গাড়ি বা মোটরসাইকেল, অটোরিক্সায় দুর্ঘটনা।
- সাইকেল থেকে পড়ে যাওয়া।
- গাড়ির ধাক্কায় আঘাত পাওয়া।
এই দুর্ঘটনাগুলোতে শিশুদের পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোতে আঘাত লাগে।
২) সবচেয়ে বেশি আঘাত পাওয়া অঙ্গগুলো
শিশুদের পেটে আঘাত লাগলে সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট অঙ্গ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- লিভার (Liver injury): সবচেয়ে বেশি আঘাত পাওয়া অঙ্গ।
- স্প্লিন (Spleen injury): রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি।
- ইনটেস্টাইন (Bowel injury): ছিদ্র (perforation) হতে পারে।
- প্যানক্রিয়াস (Pancreatic injury): হজমের সমস্যা তৈরি হয়।
- মূত্রথলি বা কিডনি: প্রসাবে রক্ত আসতে পারে।
এই অঙ্গগুলোতে আঘাত লাগলে শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
৩) লক্ষণ (Symptoms & Signs)
শিশুর পেটে আঘাত লাগলে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা যায়। এগুলো দেখে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
- পেট ব্যথা বা ফুলে যাওয়া।
- বমি বা বমির ভাব।
- মুখে ফ্যাকাশে ভাব (shock-এর লক্ষণ)।
- রক্তচাপ কমে যাওয়া, পালস বেড়ে যাওয়া।
- প্রসাবে রক্ত (Hematuria)।
- Seatbelt বা bruise এর দাগ।
এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হবে।
৪) পরীক্ষা (Investigations)
শিশুর পেটে আঘাত লাগলে সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য কিছু পরীক্ষা করা হয়।
- FAST (Focused Abdominal Sonography in Trauma): দ্রুত রক্ত আছে কিনা দেখা হয়।
- Ultrasound whole abdomen: অঙ্গগুলোর অবস্থা বোঝা যায়।
- CT scan (Abdomen): internal organ injury নির্ণয়ে সবচেয়ে ভালো।
- CBC, Hb, Hct: রক্তের পরিমাণ বোঝার জন্য।
- Urine R/M/E: প্রসাবে রক্ত আছে কিনা দেখা হয়।
এই পরীক্ষাগুলো চিকিৎসককে সঠিকভাবে চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে।
৫) জটিলতা (Complications)
শিশুর পেটে আঘাত লাগলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
- অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ।
- অঙ্গ ছিদ্র হয়ে সংক্রমণ।
- Shock হয়ে জীবন ঝুঁকি।
তাই সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত জরুরি।
৬) প্রতিরোধ (Prevention)
শিশুদের পেটে আঘাত প্রতিরোধ করা সম্ভব কিছু সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে।
- শিশুকে সঠিকভাবে সিটবেল্ট ব্যবহার করানো।
- সাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ও সুরক্ষা ব্যবহার।
- শিশুকে রাস্তার ধারে খেলতে না দেওয়া।
অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুদের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে।
৭) প্রাথমিক চিকিৎসা ও রিসাসিটেশন (Initial Management & Resuscitation)
শিশুর পেটে আঘাত লাগলে প্রথমেই জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা নিতে হয়। চিকিৎসকরা ABC protocol অনুসরণ করেন — Airway, Breathing, Circulation।
- Airway: শিশুর শ্বাসনালী খোলা রাখতে হয়। প্রয়োজনে অক্সিজেন দেওয়া হয়।
- Breathing: শ্বাসকষ্ট থাকলে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দেওয়া হয়।
- Circulation: IV fluid দিয়ে রক্তচাপ স্থিতিশীল করা হয়। প্রয়োজনে রক্ত দেওয়া হয়।
এই ধাপগুলো শিশুর জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৮) ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও সাপোর্টিভ কেয়ার
শিশুর পেটে আঘাত লাগলে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। তাই ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
- প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন দেওয়া যায়।
- গুরুতর ক্ষেত্রে Morphine ব্যবহার করা হয়।
- শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
সাপোর্টিভ কেয়ারের মাধ্যমে শিশুর অবস্থা স্থিতিশীল রাখা হয়।
৯) Observation (পর্যবেক্ষণ)
যেসব শিশুদের আঘাত সামান্য এবং অবস্থা স্থিতিশীল, তাদের হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
- নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয়।
- রক্তচাপ, পালস, প্রস্রাব পর্যবেক্ষণ করা হয়।
- শিশুর পেটের অবস্থা প্রতিদিন পরীক্ষা করা হয়।
পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় যে আঘাত গুরুতর হয়নি।
১০) সার্জিক্যাল চিকিৎসা (Surgical Treatment)
যদি পেটের ভিতরে active bleeding, hollow viscus perforation বা peritonitis থাকে তবে সার্জারি করতে হয়।
- Laparotomy: পেট কেটে ভেতরের রক্তক্ষরণ বন্ধ করা হয়।
- Perforation repair: অন্ত্রে ছিদ্র হলে তা মেরামত করা হয়।
- Splenectomy: স্প্লিন গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা অপসারণ করা হয়।
সার্জারি শিশুর জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলো‑আপ (Follow-up)
সার্জারি বা চিকিৎসার পর শিশুকে নিয়মিত ফলো‑আপে রাখতে হয়।
- নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা।
- আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা CT scan করে অঙ্গের অবস্থা দেখা।
- শিশুর খাওয়ার অভ্যাস ও ওজন পর্যবেক্ষণ।
ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় যে শিশুর শরীরে নতুন কোনো জটিলতা হয়নি।
প্রগনোসিস (Prognosis)
শিশুদের পেটে আঘাতের প্রগনোসিস নির্ভর করে আঘাতের মাত্রা ও চিকিৎসার সময়ের উপর।
- সামান্য আঘাত — পর্যবেক্ষণে ভালো হয়ে যায়।
- গুরুতর আঘাত — সার্জারি প্রয়োজন হয়।
- দ্রুত চিকিৎসা করলে শিশুরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।
তবে দেরি হলে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুদের পেটে আঘাত প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
- শিশুকে সঠিকভাবে সিটবেল্ট ব্যবহার করানো।
- সাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ও সুরক্ষা ব্যবহার।
- শিশুকে রাস্তার ধারে খেলতে না দেওয়া।
- দুর্ঘটনা হলে দেরি না করে হাসপাতালে নেওয়া।
অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর জীবন বাঁচাতে এবং ভবিষ্যতের জটিলতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
শেষ কথাঃ (Conclusion)
এক্সিডেন্টে পেটে আঘাত শিশুদের মধ্যে একটি গুরুতর সমস্যা হলেও সময়মতো চিকিৎসা করলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রাথমিক রিসাসিটেশন, পর্যবেক্ষণ, সার্জারি এবং ফলো‑আপ শিশুর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464
