থ্যালাসেমিয়া ও স্প্লিনেক্টমি: ৫টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

থ্যালাসেমিয়া ও স্প্লিনেক্টমি: ৫টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

থ্যালাসেমিয়া একটি জেনেটিক রক্তের রোগ যেখানে হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকে। নিয়মিত রক্তদানের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা হয়, কিন্তু অনেক সময় প্লীহা (spleen) বড় হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তকণিকা ধ্বংস করতে শুরু করে।

থ্যালাসেমিয়া-ও-স্প্লিনেক্টমি

এই অবস্থাকে বলা হয় Hypersplenism। তখন রোগীর রক্তাল্পতা আরও বেড়ে যায়, রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা দ্বিগুণ হয়ে যায়, এবং শরীরে আয়রন জমে জটিলতা তৈরি করে। এ অবস্থায় চিকিৎসকরা স্প্লেনেক্টমি (splenectomy)—অর্থাৎ প্লীহা অপসারণের কথা বিবেচনা করেন।

১) কেন স্প্লেনেক্টমি করা হয়

থ্যালাসেমিয়ায় প্লীহা বড় হয়ে গেলে তা RBC, WBC এবং প্লেটলেট ধ্বংস করতে থাকে। এর ফলে রোগীর রক্তাল্পতা বাড়ে, সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে, এবং transfusion dependency অনেক বেড়ে যায়। যখন রক্তদানের প্রয়োজন স্বাভাবিকের দ্বিগুণ হয়ে যায়, বা প্লীহা এত বড় হয় যে পেটের ব্যথা, অস্বস্তি ও খাওয়ার সমস্যা হয়, তখন স্প্লেনেক্টমি করা হয়। এছাড়া pancytopenia (সব ধরনের রক্তকণিকা কমে যাওয়া) বা অতিরিক্ত আয়রন জমে গেলে অপারেশন বিবেচনা করা হয়।

  • রক্তদানের প্রয়োজন স্বাভাবিকের দ্বিগুণ হয়ে গেলে
  • প্লীহা বড় হয়ে পেটের ব্যথা ও অস্বস্তি তৈরি করলে
  • Pancytopenia হলে (RBC, WBC, Platelet কমে গেলে)
  • অতিরিক্ত আয়রন জমে জটিলতা তৈরি করলে

২) স্প্লেনেক্টমির সুবিধা

স্প্লেনেক্টমি করার পর রোগীর শরীরে রক্তকণিকা ধ্বংসের হার কমে যায়। প্লীহা অপসারণের ফলে RBC, WBC এবং Platelet আর অস্বাভাবিকভাবে নষ্ট হয় না। এর ফলে transfusion dependency কমে যায় এবং রোগীকে আগের মতো ঘন ঘন রক্ত নিতে হয় না। সাধারণত রক্তদানের প্রয়োজন ৩০–৫০% কমে যায়, যা রোগীর জন্য বড় স্বস্তি। হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কিছুটা বেড়ে যায়, ফলে রোগীর শক্তি ও দৈনন্দিন কাজকর্মে সহায়তা করে। পেটের ফোলা ও অস্বস্তি কমে যায়, রোগী স্বাভাবিকভাবে খেতে পারে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। transfusion interval দীর্ঘ হয়, অর্থাৎ রক্তদানের ফ্রিকোয়েন্সি কমে যায়। এর ফলে শরীরে আয়রন জমার ঝুঁকি কিছুটা কমে এবং রোগী মানসিকভাবে স্বস্তি পায়।

  • রক্ত নষ্ট হওয়া কমে যায়
  • রক্তদানের প্রয়োজন ৩০–৫০% কমে যায়
  • হিমোগ্লোবিন কিছুটা বেড়ে যায়
  • পেটের ফোলা ও অস্বস্তি কমে যায়

৩) অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি ও সতর্কতা

স্প্লেনেক্টমির পর শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা কমে যায়, কারণ প্লীহা শরীরের ইমিউন সিস্টেমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্লীহা অপসারণের ফলে শরীর কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে Streptococcus pneumoniae, Haemophilus influenzae, Neisseria meningitidis এর মতো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। রোগীর শরীরে Sepsis বা মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে, যা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে। তাই অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে রোগীকে বিশেষ সতর্কতা নিতে হয়। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী টিকা, অ্যান্টিবায়োটিক এবং নিয়মিত ফলো‑আপ অত্যন্ত জরুরি। রোগীকে শেখানো হয় যে সামান্য জ্বর বা অসুস্থতাতেও দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

  • সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়
  • Sepsis বা মারাত্মক ইনফেকশন হতে পারে
  • প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা কমে যায়

৪) প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

স্প্লেনেক্টমির আগে ও পরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। অস্ত্রোপচারের আগে Pneumococcal, Hib এবং Meningococcal ভ্যাকসিন দেওয়া বাধ্যতামূলক। এগুলো রোগীর শরীরকে মারাত্মক সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। অস্ত্রোপচারের পর নিয়মিত টিকা ও বার্ষিক ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন নিতে হয়। কয়েক বছর বা দীর্ঘমেয়াদে প্রফাইল্যাকটিক অ্যান্টিবায়োটিক চালিয়ে যেতে হয়, যেমন Penicillin। রোগীকে শেখানো হয় যে সামান্য জ্বর বা অসুস্থতাতেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে স্প্লেনেক্টমির পর সংক্রমণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। তাই রোগী ও পরিবারের সচেতনতা অপরিহার্য

  • অস্ত্রোপচারের আগে টিকা: Pneumococcal, Hib, Meningococcal
  • অস্ত্রোপচারের পর নিয়মিত টিকা ও বার্ষিক ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন
  • দীর্ঘমেয়াদে প্রফাইল্যাকটিক অ্যান্টিবায়োটিক
  • সামান্য জ্বর বা অসুস্থতায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ

৫) শিশুদের ক্ষেত্রে

শিশুদের ক্ষেত্রে স্প্লেনেক্টমি করার সিদ্ধান্ত আরও জটিল এবং সংবেদনশীল। সাধারণত ৫ বছরের আগে স্প্লেনেক্টমি করা হয় না, কারণ ছোট শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠে না, তাই প্লীহা অপসারণ করলে তারা মারাত্মক সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে একজন পেডিয়াট্রিক সার্জন অপারেশনের সময়কাল ও ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত পরামর্শ দেন এবং অপারেশন পরিচালনা করেন। শিশুদের জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও কঠোরভাবে মানতে হয়। টিকা, অ্যান্টিবায়োটিক এবং নিয়মিত ফলো‑আপ তাদের জন্য অপরিহার্য। অভিভাবকদেরও সচেতন থাকতে হয় এবং সামান্য অসুস্থতায় দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হয়

  • ৫ বছরের আগে স্প্লেনেক্টমি করা হয় না
  • শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি
  • পেডিয়াট্রিক সার্জন অপারেশন পরিচালনা করেন
থ্যালাসেমিয়া ও স্প্লিনেক্টমি
থ্যালাসেমিয়া হলো রক্তের একটা জেনেটিক রোগ যা হিমোগ্লোবিনের উৎপাদনকে ব্যাহত করে, ফলে লোহিত রক্তকণিকা সঠিকভাবে গঠিত হয় না এবং শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। এটি প্রধানত দুই ধরনের: আলফা থ্যালাসেমিয়া এবং বিটা থ্যালাসেমিয়া, যেখানে বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর সবচেয়ে গুরুতর ফর্ম, যাতে শিশুকাল থেকে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন দরকার হয়। রোগীরা ক্লান্তি, প্যালর, বৃদ্ধির সমস্যা এবং অঙ্গের ক্ষতি অনুভব করে, যা আয়রন ওভারলোডের কারণে হার্ট, লিভার এবং অন্যান্য অঙ্গকে প্রভাবিত করে।

থ্যালাসেমিয়ায় স্প্লিনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অস্বাভাবিক রক্তকণিকা স্প্লিনে ধ্বংস হয়, যা স্প্লিনকে বড় করে (স্প্লেনোমেগালি) এবং হাইপারস্প্লেনিজম তৈরি করে, ফলে রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। স্প্লিনেক্টমি এখানে আসে যখন অন্য চিকিত্সা যেমন রক্ত সঞ্চালন এবং আয়রন চেলেশন ব্যর্থ হয় বা রক্তাল্পতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এটি রোগীর জীবনমান উন্নত করে কিন্তু নতুন ঝুঁকি নিয়ে আসে, যা চিকিত্সকদের সিদ্ধান্তকে জটিল করে।

থ্যালাসেমিয়ার চিকিত্সায় স্প্লিনেক্টমির ইন্ডিকেশন প্রধানত হাইপারস্প্লেনিজম, যেখানে স্প্লিন অতিরিক্ত রক্তকণিকা ধ্বংস করে রক্ত সঞ্চালনের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়ে দেয় (বছরে ২০০-২৫০ মিলি/কেজি PRBC) বা হিমোগ্লোবিন ১০ গ্রাম/ডিএল-এর নিচে রাখতে অক্ষম হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে HbH রোগে এটি সাহায্য করে, যেখানে স্প্লিনে ইনক্লুশন বডি ধ্বংস হয়। প্রস্তুতিতে রক্ত পরীক্ষা করে হিমোগ্লোবিন এবং প্লেটলেট নিশ্চিত করা হয়, ভ্যাকসিন দেওয়া হয় এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইল্যাক্সিস শুরু হয়।

অস্ত্রোপচারের সময়, ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতি পছন্দ করা হয় ছোট ছিদ্রের জন্য, যা কম রক্তপাত এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার দেয়, কিন্তু বড় স্প্লিন (২২-৩০ সেন্টিমিটার) এর ক্ষেত্রে ওপেন সার্জারি দরকার হয়। প্রক্রিয়ায় স্প্লিনিক ধমনী প্রথমে লাইগেট করা হয়, তারপর ভেইন, এবং অ্যাক্সেসরি স্প্লিন অনুসন্ধান করা হয়। পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ারে ড্রেন রাখা হয় এবং অ্যাসপিরিন দেওয়া হয় যদি প্লেটলেট বাড়ে।


উপকারিতা দেখা যায় যে রক্ত সঞ্চালন কমে (সপ্তাহে ১-২ থেকে তিন মাসে ১-২), হিমোগ্লোবিন বাড়ে (৫.৯২ থেকে ৯.৭ গ্রাম/ডিএল) এবং প্লেটলেট স্থিতিশীল হয়, যা আয়রন ওভারলোড কমায় এবং রোগীর ক্লান্তি, পেটের ব্যথা দূর করে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং জীবনমান উন্নত করে। কিন্তু ঝুঁকি অনেক: সংক্রমণের সম্ভাবনা (OPSI ০.৫-১%, যা ভ্যাকসিন দিয়ে কমানো যায় কিন্তু ম্যালেরিয়া অঞ্চলে বাড়ে), থ্রম্বোসিস (৫%), পালমোনারি হাইপারটেনশন (১০.৩%) এবং রক্ত জমাট বাঁধা, যা দীর্ঘমেয়াদী (২-৩৫ বছর পর) দেখা যায়।

অস্ত্রোপচারের সময় রক্তপাত, অ্যাটেলেকটাসিস বা অঙ্গের আঘাত হতে পারে। কোচরেন রিভিউতে দেখা গেছে যে উচ্চ-মানের প্রমাণের অভাব, শুধু একটা ছোট RCT আছে যা ল্যাপারোস্কোপিক vs ওপেন-এর তুলনা করে, যাতে হাসপাতাল স্টে কম (৫ vs ৬.৫ দিন) কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নেই। অবজার্ভেশনাল স্টাডিজে উপকার দেখা যায় কিন্তু ঝুঁকি অফসেট করতে পারে না। শিশুদের ক্ষেত্রে স্প্লিনেক্টমি ৪-৫ বছর বয়সের পর করা হয় যাতে ইমিউন সিস্টেম ম্যাচিউর হয়, এবং এটি hypersplenism-এ সাহায্য করে কিন্তু VTE-এর ঝুঁকি বাড়ায়, তাই অ্যাসপিরিন দেওয়া হয় যদি প্লেটলেট ৬০০,০০০/মাইক্রোলিটার ছাড়ায়। 

ফলাফল মিশ্র: একটা সিরিজে ৭টা শিশুতে কোনো মৃত্যু নেই, হিমোগ্লোবিন ৬২% বাড়ে এবং ট্রান্সফিউশন কমে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী অধ্যয়ন কম। পার্শিয়াল স্প্লিনেক্টমি ইমিউন ফাংশন রক্ষা করতে পারে কিন্তু সাফল্য অজানা। চিকিত্সকের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিন, কারণ আধুনিক ট্রান্সফিউশন এবং চেলেশন স্প্লিনেক্টমির প্রয়োজনীয়তা কমিয়েছে (১৯৬০-এ ৫৭% থেকে ১৯৯০-এ ৭%)।

শেষ কথাঃ
থ্যালাসেমিয়ায় স্প্লেনেক্টমি একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি, তবে এটি সব রোগীর জন্য নয়। যখন প্লীহা অতিরিক্ত বড় হয়ে যায়, রক্তদানের প্রয়োজন দ্বিগুণ হয়ে যায়, বা pancytopenia দেখা দেয়, তখনই অপারেশন বিবেচনা করা হয়। অপারেশনের পর রোগীর transfusion প্রয়োজন কমে যায়, হিমোগ্লোবিন কিছুটা বেড়ে যায়, এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। তবে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়, তাই টিকা, অ্যান্টিবায়োটিক এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

 মনে রাখো: স্প্লেনেক্টমি জীবনমান উন্নত করতে পারে, কিন্তু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শই নিরাপত্তার মূল। 250464