এপেন্ডিসাইটিসের ৫টি প্রধান দিক: কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও সতর্কতা
এপেন্ডিসাইটিস (Appendicitis) হচ্ছে অন্ত্রের সাথে যুক্ত ছোট্ট অঙ্গ অ্যাপেন্ডিক্সে প্রদাহ। তুমি যদি হঠাৎ করে নাভির আশেপাশে শুরু হয়ে ডান দিকের নিচে গিয়ে স্থির হওয়া পেট ব্যথায় ভুগো, সঙ্গে হালকা জ্বর, বমি বমি ভাব, খাবারে অরুচি থাকে—তাহলে এপেন্ডিসাইটিসের সম্ভাবনা থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও জটিল, কারণ তারা অনেক সময় শুধু বলে “পেট ব্যথা” বা “ভালো লাগছে না।” সময়মতো চিকিৎসা না নিলে অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে গিয়ে পেরিটোনাইটিস বা অ্যাবসেস হতে পারে, যা জীবনঝুঁকি বাড়ায়। তাই এপেন্ডিসাইটিস সম্পর্কে বিস্তারিত জানা তোমার জন্য জরুরি।
১) কারণ (Causes)
এপেন্ডিসাইটিস সাধারণত অ্যাপেন্ডিক্সের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে হয়। মুখ বন্ধ হলে ভেতরে ব্যাকটেরিয়া জমে দ্রুত সংক্রমণ বাড়ে। সবচেয়ে প্রচলিত কারণ হলো মল জমে ছোট গাঁট তৈরি হওয়া (fecalith)। এছাড়া ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত অন্ত্রের সংক্রমণে লিম্ফ টিস্যু ফুলে গিয়ে পথ সরু হয়ে যায়। বিরলভাবে বিদেশি বস্তু, পরজীবী বা টিউমারও ব্লকেজ ঘটাতে পারে। খাদ্যাভ্যাসে কম ফাইবার ও দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য ঝুঁকি বাড়ায়।
• মল জমে গাঁট হয়ে মুখ বন্ধ করে (fecalith)
• ভাইরাস/ব্যাকটেরিয়ায় লিম্ফ টিস্যু ফুলে যায়
• বিদেশি বস্তু বা পরজীবী লুমেন আটকে দেয়
• টিউমার বা নবগঠিত টিস্যু পথ বন্ধ করে
• কম ফাইবার ও দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য ঝুঁকি বাড়ায়
২) লক্ষণ (Symptoms)
লক্ষণগুলো চিনতে পারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলোই তোমাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। সাধারণত ব্যথা প্রথমে নাভির আশেপাশে diffuse থাকে, পরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ডান নিচে লোকালাইজড হয়। সঙ্গে থাকে হালকা থেকে মাঝারি জ্বর, বমি বমি ভাব বা বমি, খাবারে অরুচি। কারও ডায়রিয়া হয়, কারও কোষ্ঠকাঠিন্য—দুইই সম্ভব। পেট ফুলে যেতে পারে, হাঁটা বা কাশি দিলে ব্যথা বাড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে তারা শুধু বলে “পেট ব্যথা” বা “ভালো লাগছে না।”
• নাভির কাছে শুরু হয়ে ডান নিচে স্থির ব্যথা
• হালকা থেকে মাঝারি জ্বর
• বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
• খাবারে অরুচি
• ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য
• পেট ফুলে যাওয়া
• শিশুদের অস্পষ্ট অভিযোগ
৩) পরীক্ষা‑নিরীক্ষা (Diagnosis)
ডায়াগনসিসে ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা, ল্যাব ও ইমেজিং—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ডাক্তার ডান নিচে চাপ দিলে ব্যথা, রিবাউন্ড টেন্ডারনেস, হাঁটলে বা কাশি দিলে ব্যথা বাড়া—এসব দেখে। রক্ত পরীক্ষায় শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) ও প্রদাহ সূচক (CRP) বেড়ে যেতে পারে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি (USG) শিশু ও পাতলা রোগীতে ভালো কাজ করে; জটিল/অস্পষ্ট ক্ষেত্রে CT scan বেশি স্পষ্টতা দেয়। গর্ভাবস্থায় MRI বিকল্প। ইউরিন পরীক্ষা দিয়ে ইউরিনারি কারণ বাদ দেয়া হয়।
• শারীরিক পরীক্ষা: ডান নিচে টেন্ডারনেস/রিবাউন্ড
• রক্ত পরীক্ষা: WBC/CRP বেড়ে যায়
• USG: শিশু ও পাতলা রোগীতে কার্যকর
• CT scan: জটিল কেসে স্পষ্টতা দেয়
• MRI: গর্ভাবস্থায় নিরাপদ বিকল্প
• ইউরিন/পেলভিক পরীক্ষা: অন্যান্য কারণ বাদ দিতে
৪) চিকিৎসা (Treatment)
এপেন্ডিসাইটিসের মূল চিকিৎসা হলো অপারেশন—অ্যাপেন্ডিসেকটোমি। আধুনিক সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি করা হয়, যেখানে ছোট ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা ও যন্ত্র প্রবেশ করিয়ে অ্যাপেন্ডিক্স সরানো হয়। এতে ক্ষত ছোট, ব্যথা কম, রিকভারি দ্রুত হয়। ওপেন সার্জারি করা হয় জটিলতা, ফেটে যাওয়া, বা টেকনিক্যাল সীমাবদ্ধতায়। অপারেশনের আগে/পরে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয়। কিছু uncomplicated কেসে অ্যান্টিবায়োটিক‑প্রথম পদ্ধতি বিবেচ্য, তবে পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থাকে।
• ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি: ছোট ক্ষত, দ্রুত সুস্থতা
• ওপেন সার্জারি: জটিলতা/ফেটে গেলে দরকার
• অ্যান্টিবায়োটিক: অপারেশনের আগে/পরে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে
• অ্যান্টিবায়োটিক‑প্রথম: নির্বাচিত কেসে, পুনরাবৃত্তি ঝুঁকি
• শিশু সার্জারি: পেডিয়াট্রিক টিমে পরিকল্পনা
৫) সতর্কতা ও জটিলতা (Complications)
চিকিৎসা দেরি করলে অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে গিয়ে পেরিটোনাইটিস হতে পারে—এটি জরুরি অবস্থা। পুঁজ জমে অ্যাবসেস হলে প্রথমে ড্রেনেজ, পরে পরিকল্পিত অপারেশন দরকার হয়। প্রদাহ ঘিরে “এপেন্ডিকুলার লাম্প” তৈরি হলে আগে কনজারভেটিভ চিকিৎসা দেয়া হয়, পরে ইলেকটিভ সার্জারি। অপারেশন‑পরবর্তী জটিলতায় ক্ষত সংক্রমণ, রক্তক্ষরণ, অ্যাডহিশন, দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা থাকতে পারে। সঠিক পরিচর্যা ও ফলো‑আপে ঝুঁকি কমে।
• ফেটে গেলে: পেরিটোনাইটিস—জরুরি অপারেশন
• অ্যাবসেস/লাম্প: আগে ড্রেন/কনজারভেটিভ, পরে অপারেশন
• ক্ষত জটিলতা: সংক্রমণ/রক্তক্ষরণ/অ্যাডহিশন
• রিকভারি রুটিন: হালকা খাবার, পানি, ধীরে হাঁটা
• সতর্ক সংকেত: উচ্চ জ্বর, ক্ষত থেকে পুঁজ, পেট শক্ত হয়ে যাওয়া
