বিলিয়ারি এট্রেশিয়া হলো একটি গুরুতর জন্মগত (congenital) লিভার ডিজঅর্ডার, যা সাধারণত নবজাতকদের মধ্যে দেখা যায়। এই রোগে শিশুর বাইল ডাক্ট (bile ducts) ঠিকমতো গঠিত হয় না অথবা জন্মের কিছুদিন পরেই ধ্বংস হয়ে যায়।
১) পরিচিতি
বিলিয়ারি এট্রেশিয়া হলো একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক রোগ, যা নবজাতকের লিভার ও পিত্তনালীর স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। সাধারণত জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। শিশুর চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যায়, পায়খানা অস্বাভাবিকভাবে হালকা রঙের হয় এবং প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হয়। লিভার ধীরে ধীরে বড় হয়ে যায় এবং শিশুর ওজন বাড়তে সমস্যা হয়। এই রোগে লিভারের ভেতরে পিত্ত জমে গিয়ে প্রদাহ ও ক্ষত তৈরি করে, যা সময়ের সাথে লিভারকে শক্ত ও অকার্যকর করে তোলে। চিকিৎসা ছাড়া শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
- প্রকৃতি: জন্মগত লিভার ডিজঅর্ডার
- প্রভাব: বাইল ডাক্ট ধ্বংস হয়ে লিভার ড্যামেজ হয়
- ঝুঁকি: চিকিৎসা না করলে সিরোসিস ও লিভার ফেলিওর
২) কারণ (Causes)
বিলিয়ারি এট্রেশিয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি সাধারণত জন্মগত সমস্যা হলেও কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাল ইনফেকশন, জেনেটিক ত্রুটি বা ইমিউন সিস্টেমের অস্বাভাবিকতার সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে। নবজাতকের গর্ভকালীন সময়ে ভাইরাস সংক্রমণ (যেমন রুবেলা বা রোটাভাইরাস) বাইল ডাক্টের স্বাভাবিক গঠনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে জেনেটিক ত্রুটি বা ইমিউন সিস্টেমের অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বাইল ডাক্টকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদিও সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি, তবে এটি স্পষ্ট যে একাধিক ফ্যাক্টর একসাথে কাজ করে এই রোগ সৃষ্টি করে।
- ভাইরাল ইনফেকশন: রুবেলা, রোটাভাইরাস ইত্যাদি
- জেনেটিক ত্রুটি: জন্মগত অস্বাভাবিকতা
- ইমিউন সিস্টেম: অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বাইল ডাক্ট ক্ষতিগ্রস্ত করে
৩) লক্ষণ (Symptoms)
বিলিয়ারি এট্রেশিয়ার লক্ষণ সাধারণত জন্মের ২–৬ সপ্তাহের মধ্যে দেখা যায়। সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিস, যেখানে শিশুর চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যায়। পায়খানা অস্বাভাবিকভাবে হালকা রঙের হয় এবং প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হয়। লিভার বড় হয়ে যায় এবং শিশুর ওজন বাড়তে সমস্যা হয়। অনেক সময় শিশুর পেটে ফাঁপাভাব দেখা দেয়। এসব লক্ষণ দেখা দিলে অভিভাবকদের উচিত দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, কারণ সময়মতো চিকিৎসা না করলে লিভার স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- জন্ডিস: চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
- হালকা রঙের পায়খানা: বাইল না পৌঁছানোর কারণে
- হলুদ প্রস্রাব: লিভারে পিত্ত জমে থাকার কারণে
- লিভার বড় হওয়া: প্রদাহ ও ক্ষতের কারণে
- ওজন না বাড়া: হজমে সমস্যা ও পুষ্টির ঘাটতি
- পেটে ফাঁপাভাব: লিভার বড় হয়ে যাওয়ার ফল
৪) পরীক্ষা ও নির্ণয় (Diagnosis)
বিলিয়ারি এট্রেশিয়া নির্ণয়ের জন্য একাধিক পরীক্ষা প্রয়োজন হয়, কারণ প্রাথমিকভাবে এটি সাধারণ জন্ডিসের মতো মনে হতে পারে। প্রথমে রক্ত পরীক্ষা করা হয়, যেখানে লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) দ্বারা লিভারের কার্যকারিতা বোঝা যায়। আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে লিভার ও বাইল ডাক্টের গঠন দেখা হয়, যা ডাক্তারকে প্রাথমিক ধারণা দেয়। হেপাটোবিলিয়ারি স্ক্যান বা HIDA scan একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, যেখানে দেখা হয় লিভার থেকে বাইল ক্ষুদ্রান্ত্রে যাচ্ছে কিনা। লিভার বায়োপসি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা, যেখানে লিভারের টিস্যু নিয়ে মাইক্রোস্কোপে দেখা হয় এবং লিভারের ক্ষতির মাত্রা নির্ণয় করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় শিশুর বিলিয়ারি এট্রেশিয়া আছে কিনা এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা করা যায়।
- রক্ত পরীক্ষা: লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT)
- আল্ট্রাসাউন্ড: লিভার ও বাইল ডাক্টের গঠন দেখা
- HIDA scan: বাইল ক্ষুদ্রান্ত্রে যাচ্ছে কিনা তা নির্ণয়
- লিভার বায়োপসি: লিভারের ক্ষতির মাত্রা নির্ণয়
৫) চিকিৎসা (Treatment)
বিলিয়ারি এট্রেশিয়ার চিকিৎসা জটিল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করতে হয়। প্রথম ধাপে কাশাই প্রোসিডিউর (Kasai Procedure) করা হয়, যা সাধারণত ২–৩ মাস বয়সের মধ্যে করা হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত বাইরের বাইল ডাক্ট সরিয়ে দিয়ে অন্ত্রের একটি অংশ দিয়ে নতুন পথ তৈরি করা হয়, যাতে লিভার থেকে বাইল ক্ষুদ্রান্ত্রে যেতে পারে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে এই প্রোসিডিউর সফল হয় এবং তারা দীর্ঘ সময় সুস্থ থাকতে পারে। তবে যদি কাশাই প্রোসিডিউর সফল না হয় বা শিশুর লিভার ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে, তাহলে লিভার ট্রান্সপ্লান্টই চূড়ান্ত সমাধান। লিভার প্রতিস্থাপন একটি জটিল কিন্তু কার্যকর চিকিৎসা, যা শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে। চিকিৎসার পাশাপাশি শিশুকে বিশেষায়িত লিভার ডায়েট দেওয়া হয়, যেখানে ফ্যাট সলিউবল ভিটামিন এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে ওষুধ দেওয়া হয়। নিয়মিত ফলো‑আপ এবং লিভার ফাংশন পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
- কাশাই প্রোসিডিউর: ২–৩ মাস বয়সে নতুন পথ তৈরি করে বাইল ড্রেইন করা
- লিভার ট্রান্সপ্লান্ট: কাশাই ব্যর্থ হলে চূড়ান্ত সমাধান
- বিশেষায়িত ডায়েট: ফ্যাট সলিউবল ভিটামিন ও লিভার‑সহায়ক খাবার
- ইনফেকশন প্রতিরোধ: নিয়মিত ওষুধ ও সচেতনতা
- ফলো‑আপ: লিভার ফাংশন নিয়মিত পরীক্ষা
৬) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
বিলিয়ারি এট্রেশিয়া একটি গুরুতর রোগ হলেও সময়মতো চিকিৎসা করলে শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। অভিভাবকদের উচিত শিশুর জন্মের পর যদি দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিস, হালকা রঙের পায়খানা বা হলুদ প্রস্রাব দেখা যায়, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। নিজে থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া বা চিকিৎসা বিলম্ব করা বিপজ্জনক হতে পারে। শিশুকে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান, বিশেষায়িত লিভার ডায়েট অনুসরণ করুন এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতন থাকুন। অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রতিটি লক্ষণ গুরুত্বের সাথে দেখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলো‑আপ করানো।
- ডাক্তার দেখান: অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত
- নিজে চিকিৎসা নয়: ওষুধ বা বিলম্ব এড়িয়ে চলুন
- বিশেষায়িত ডায়েট: ফ্যাট সলিউবল ভিটামিন ও লিভার‑সহায়ক খাবার
- সংক্রমণ প্রতিরোধ: নিয়মিত ওষুধ ও পরিচ্ছন্নতা
- ফলো‑আপ: নিয়মিত লিভার ফাংশন পরীক্ষা
৭) শেষ কথাঃ
বিলিয়ারি এট্রেশিয়া নবজাতকদের মধ্যে একটি গুরুতর জন্মগত লিভার রোগ, যা সময়মতো চিকিৎসা না করলে সিরোসিস, লিভার ফেলিওর এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে কাশাই প্রোসিডিউর বা লিভার ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে অনেক শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রতিটি লক্ষণ গুরুত্বের সাথে দেখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। মনে রাখুন, দীর্ঘস্থায়ী জন্ডিস বা অস্বাভাবিক পায়খানা কখনো অবহেলা করবেন না। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান এবং নিয়মিত ফলো‑আপ করুন। 250464
