বাচ্চাদের প্রস্রাবের ইনফেকশন (UTI): শিশুস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা — ৭টি মূল দিক

প্রস্রাবের সংক্রমণ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) হলো শিশুদের মধ্যে একটি সাধারণ কিন্তু গুরুতর সমস্যা। অতীতে বড় পরিবারে অনেকগুলো শিশু থাকায় আলাদাভাবে প্রতিটি শিশুর দিকে নজর দেওয়া সম্ভব হতো না। ফলে অনেক সময় সংক্রমণ ধরা পড়তে দেরি হতো। কিন্তু বর্তমানে ছোট পরিবারে শিশুদের প্রতি যত্ন ও সচেতনতা বেড়েছে। এর ফলে চিকিৎসকরা দ্রুত রোগ নির্ণয় করতে পারেন এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে পারেন।

১) UTI কী

UTI হলো প্রস্রাবের পথে জীবাণুর সংক্রমণ। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালী দিয়ে প্রবেশ করে মূত্রথলি বা কিডনিতে পৌঁছায় এবং সংক্রমণ ঘটায়। শিশুদের মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে। কারণ তাদের মূত্রনালী ছোট ও প্রশস্ত হওয়ায় জীবাণু সহজে প্রবেশ করতে পারে।

২) কী কী সমস্যা হতে পারে

শিশুদের UTI হলে বিভিন্ন ধরণের উপসর্গ দেখা দেয়। এগুলো বয়সভেদে ভিন্ন হতে পারে। নবজাতক বা ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে উপসর্গগুলো বোঝা কঠিন হলেও বড় শিশুদের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।

  • বারবার বা ঘন ঘন প্রস্রাব করা — সংক্রমণের কারণে মূত্রথলি উত্তেজিত হয়।
  • ফোঁটাফোঁটা প্রস্রাব — প্রস্রাব সম্পূর্ণ বের হতে না পারা।
  • প্রস্রাবে জ্বালা-পোড়া — জীবাণুর কারণে প্রস্রাবের সময় ব্যথা হয়।
  • তলপেটে ব্যথা বা জ্বর — সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে জ্বর ও ব্যথা দেখা দেয়।

এই উপসর্গগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।

৩) কারণসমূহ (Causes)

শিশুদের UTI হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এগুলো সাধারণত ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যাভ্যাস ও জন্মগত ত্রুটির সাথে সম্পর্কিত।

  • ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব: মলত্যাগের পর সঠিকভাবে পরিষ্কার না করলে জীবাণু মূত্রনালীতে প্রবেশ করতে পারে। মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে পিছন থেকে সামনে মোছা হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য: অন্ত্রে জমা মল মূত্রনালীর উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
  • প্রস্রাব চেপে রাখা: দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে রাখলে জীবাণু মূত্রথলিতে জমে সংক্রমণ ঘটায়।
  • অপর্যাপ্ত পানি পান: কম পানি খেলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায় এবং জীবাণু বের হতে পারে না।
  • জন্মগত ত্রুটি: মূত্রনালীর প্রবাহে কোনো বাধা থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

অতএব, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো এবং জন্মগত সমস্যার চিকিৎসা শিশুদের UTI প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।

৪) প্রতিরোধ (Prevention)

UTI প্রতিরোধ করা সম্ভব কিছু সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে। অভিভাবকদের সচেতনতা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

  • কিডনি, মূত্রনালী বা মূত্রথলিতে জন্মগত ত্রুটি থাকলে তার চিকিৎসা করতে হবে।
  • শিশুকে প্রচুর পানি ও তরল খাবার খাওয়াতে হবে।
  • শিশুর ব্যক্তিগত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিষ্কার রাখতে হবে। ডায়াপার সময়মতো পরিবর্তন করতে হবে।
  • টয়লেট ব্যবহারের সময় মেয়েশিশুদের সবসময় সামনে থেকে পিছনের দিকে মোছার অভ্যাস করাতে হবে।
  • শিশুকে নিয়মিত প্রস্রাব করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয়ে, কার্টুন দেখার সময় বা খেলাধুলার সময় যেন প্রস্রাব চেপে না রাখে সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শিশুর সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং UTI হওয়ার ঝুঁকি কমায়।

৫) পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Diagnosis)

UTI নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা করেন। সবচেয়ে সাধারণ হলো প্রস্রাব পরীক্ষা, যেখানে জীবাণুর উপস্থিতি দেখা যায়। এছাড়া আল্ট্রাসনোগ্রাম করে কিডনি ও মূত্রথলির অবস্থা দেখা হয়।

  • প্রস্রাব পরীক্ষা: সংক্রমণ আছে কিনা তা নিশ্চিত করা হয়।
  • আল্ট্রাসনোগ্রাম: কিডনি ও মূত্রথলির গঠন দেখা হয়।

এই পরীক্ষাগুলো চিকিৎসককে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে শিশুর UTI হয়েছে কিনা এবং সংক্রমণ কতটা গুরুতর।

৬) চিকিৎসা (Treatment)

শিশুদের UTI চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো সংক্রমণ দূর করা, ব্যথা কমানো এবং ভবিষ্যতে পুনরায় সংক্রমণ প্রতিরোধ করা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলেই সংক্রমণ ভালো হয়ে যায়। তবে গুরুতর সংক্রমণ হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়।

  • অ্যান্টিবায়োটিক: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় ধরে খেতে হয়।
  • ব্যথা নিয়ন্ত্রণ: প্রস্রাবের সময় ব্যথা হলে ব্যথানাশক দেওয়া হয়।
  • পানি গ্রহণ বৃদ্ধি: বেশি পানি খেলে প্রস্রাব পাতলা হয় এবং জীবাণু বের হয়ে যায়।
  • জন্মগত ত্রুটি থাকলে: সার্জারির মাধ্যমে সংশোধন করতে হয়।

চিকিৎসা শুরু করার পর সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে উপসর্গ কমে যায়। তবে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রাখলে সংক্রমণ আবারও হতে পারে।

৭) জটিলতা (Complications)

UTI চিকিৎসা না করলে বা দেরি হলে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে। সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে পড়লে কিডনির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

  • কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া।
  • বারবার সংক্রমণ হয়ে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা তৈরি হওয়া।
  • উচ্চ রক্তচাপ।
  • শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন কমে যাওয়া।

তাই সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত জরুরি।

৩) ফলো‑আপ (Follow-up)

UTI চিকিৎসার পর শিশুকে নিয়মিত ফলো‑আপে রাখতে হয়। কারণ সংক্রমণ আবারও হতে পারে। চিকিৎসক সাধারণত প্রস্রাব পরীক্ষা ও আল্ট্রাসনোগ্রাম করে কিডনির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।

  • প্রস্রাব পরীক্ষা করে জীবাণু আছে কিনা দেখা।
  • আল্ট্রাসনোগ্রাম করে কিডনি ও মূত্রথলির অবস্থা দেখা।
  • শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন পর্যবেক্ষণ।

ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় যে শিশুর কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে এবং নতুন সংক্রমণ হয়নি।

প্রগনোসিস (Prognosis)

শিশুদের UTI-এর প্রগনোসিস সাধারণত ভালো, যদি সময়মতো চিকিৎসা করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে সংক্রমণ ভালো হয়ে যায়। তবে জন্মগত ত্রুটি থাকলে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

  • সাধারণ সংক্রমণ — অ্যান্টিবায়োটিক খেলে ভালো হয়ে যায়।
  • গুরুতর সংক্রমণ — হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা করতে হয়।
  • জন্মগত ত্রুটি — সার্জারির মাধ্যমে সংশোধন করতে হয়।

বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে শিশুদের UTI সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব।

 অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ

অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। শিশুর যদি প্রস্রাবে ব্যথা, রক্ত বা বারবার সংক্রমণ হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

  • শিশুকে পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো।
  • অতিরিক্ত লবণ ও প্রোটিনযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা।
  • প্রস্রাবের সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা করা।
  • শিশুকে নিয়মিত প্রস্রাব করার অভ্যাস করানো।
  • মেয়েশিশুদের টয়লেট ব্যবহারের সময় সঠিকভাবে পরিষ্কার করার অভ্যাস করানো।

অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর কিডনি সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতে UTI হওয়ার ঝুঁকি কমায়।

 শেষ কথাঃ (Conclusion)

বাচ্চাদের প্রস্রাবের ইনফেকশন (UTI) একটি সাধারণ সমস্যা হলেও সময়মতো চিকিৎসা করলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ফলো‑আপের মাধ্যমে শিশুদের কিডনি সুস্থ রাখা যায়। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464