কিডনি ও মূত্রনালীর পাথর (Renal Stone): শিশুদের মধ্যে একটি গুরুতর সমস্যা — ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক
১) কিডনি পাথর কী
কিডনি পাথর হলো প্রস্রাবে থাকা বিভিন্ন খনিজ পদার্থ যেমন ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিড বা সিস্টিন জমে গিয়ে শক্ত গঠন তৈরি করা। এগুলো কিডনির ভেতরে, ইউরেটার, মূত্রথলি বা ইউরেথ্রায় তৈরি হতে পারে। ছোট পাথর অনেক সময় প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়, কিন্তু বড় পাথর মূত্রনালীর প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং তীব্র ব্যথা ও সংক্রমণ ঘটায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও জটিল হতে পারে কারণ তাদের শরীর ছোট এবং কিডনির কার্যক্ষমতা দ্রুত কমে যেতে পারে।
২) শিশুদের মধ্যে কিডনি পাথরের কারণ
শিশুদের মধ্যে কিডনি পাথর হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, যার ফলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায় এবং খনিজ পদার্থ জমে পাথর তৈরি হয়। এছাড়া বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ, জন্মগত ত্রুটি, খাদ্যাভ্যাস এবং বংশগত রোগও এর জন্য দায়ী।
- মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI): বারবার সংক্রমণ হলে স্ট্রুভাইট নামক বিশেষ ধরণের পাথর তৈরি হতে পারে। এটি শিশুদের মধ্যে একটি বড় কারণ।
- জন্মগত ত্রুটি: মূত্রনালীর গঠনগত সমস্যার কারণে প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা তৈরি হয় এবং পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
- ডিহাইড্রেশন: পর্যাপ্ত পানি না খেলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায় এবং তাতে খনিজ জমে পাথর তৈরি হয়। শিশুদের মধ্যে এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
- খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা প্রাণীজ প্রোটিন গ্রহণ করলে প্রস্রাবে খনিজের মাত্রা বেড়ে যায় এবং পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
- বংশগত রোগ: যেমন সিস্টিনিউরিয়া বা অন্যান্য বিপাকীয় ব্যাধি থাকলে পাথর হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে হলে এমন রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
অতএব, শিশুদের মধ্যে কিডনি পাথর হওয়ার কারণগুলো বহুমাত্রিক এবং অভিভাবকদের সচেতনতা এখানে অত্যন্ত জরুরি।
৩) ঝুঁকির কারণ (Risk Factors)
শিশুদের মধ্যে কিডনি পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় এমন কিছু বিষয় হলো পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ এবং জন্মগত ত্রুটি। এছাড়া যেসব পরিবারে আগে থেকে কিডনি পাথরের ইতিহাস আছে, তাদের শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।
- পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া — ডিহাইড্রেশন শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
- অতিরিক্ত লবণ ও প্রোটিনযুক্ত খাবার — খাদ্যাভ্যাসের কারণে প্রস্রাবে খনিজের মাত্রা বেড়ে যায়।
- বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ — সংক্রমণ থেকে পাথর তৈরি হতে পারে।
- জন্মগত মূত্রনালীর ত্রুটি — প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা তৈরি করে।
- বংশগত রোগ — পরিবারে ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেশি।
এই ঝুঁকির কারণগুলো জানা থাকলে অভিভাবকরা শিশুদের জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন।
৪) লক্ষণ (Symptoms)
শিশুদের কিডনি পাথরের লক্ষণ অনেক সময় বয়স্কদের মতোই হয়, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এগুলো আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো পিঠে বা পেটের পাশে তীব্র ব্যথা, যা কুঁচকি পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। এছাড়া প্রস্রাবে রক্ত আসা, ঘন ঘন সংক্রমণ এবং প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া দেখা যায়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে তারা ব্যথা বোঝাতে না পারলেও কান্না, অস্থিরতা বা খাওয়ার অনীহা থেকে অভিভাবকরা বিষয়টি বুঝতে পারেন।
- পিঠে বা পেটের পাশে তীব্র ব্যথা — এটি কিডনি পাথরের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ।
- প্রস্রাবে রক্ত আসা — পাথর মূত্রনালীর দেয়ালে ঘষা লাগালে রক্ত আসতে পারে।
- ঘন ঘন প্রস্রাবের সংক্রমণ — পাথরের কারণে প্রস্রাব জমে গিয়ে সংক্রমণ হয়।
- প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া — শিশুদের অস্বস্তি ও কান্নার কারণ হতে পারে।
এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
৫) ডায়াগনসিস (Diagnosis)
কিডনি পাথর নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা করেন। আল্ট্রাসনোগ্রাফি হলো সবচেয়ে সাধারণ পরীক্ষা, যেখানে কিডনির ভেতরে বা মূত্রনালীতে পাথর দেখা যায়। এক্স-রে (KUB) কিছু ধরণের পাথর শনাক্ত করতে সাহায্য করে। ছোট পাথর বা জটিল ক্ষেত্রে CT Scan করা হয়। এছাড়া প্রস্রাব ও রক্ত পরীক্ষা করে সংক্রমণ এবং কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।
- Ultrasound: কিডনির ভেতরে বা মূত্রনালীতে পাথর দেখা যায়।
- X-ray (KUB): কিছু ধরণের পাথর এক্স-রেতে দেখা যায়।
- CT Scan: ছোট পাথরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
- Urine test: প্রস্রাবে সংক্রমণ বা খনিজ পদার্থের মাত্রা দেখা হয়।
- Blood test: কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।
এই পরীক্ষাগুলো চিকিৎসককে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে শিশুর কিডনিতে পাথর আছে কিনা এবং তার আকার কত বড়।
৬) জটিলতা (Complications)
কিডনি পাথর চিকিৎসা না করলে বা দেরি হলে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে। পাথর বড় হয়ে গেলে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া বারবার প্রস্রাবের সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ এবং শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
৭) চিকিৎসা (Treatment)
শিশুদের কিডনি পাথরের চিকিৎসা নির্ভর করে পাথরের আকার, অবস্থান, উপসর্গ এবং কিডনির কার্যক্ষমতার উপর। ছোট পাথর অনেক সময় নিজে থেকেই প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়। তবে বড় পাথর হলে চিকিৎসকের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো ব্যথা কমানো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং পাথর অপসারণ করা।
- ব্যথা নিয়ন্ত্রণ: শিশুদের তীব্র ব্যথা হলে চিকিৎসক ব্যথানাশক ওষুধ দেন।
- সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ: প্রস্রাবে সংক্রমণ থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
- পানি গ্রহণ বৃদ্ধি: পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো হয় যাতে ছোট পাথর বের হয়ে যেতে পারে।
এই প্রাথমিক চিকিৎসা শিশুকে স্বস্তি দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ছোট পাথর নিজে থেকেই বের হয়ে যায়।
৮) সার্জারি ও অন্যান্য পদ্ধতি
যদি পাথর বড় হয়, মূত্রনালীর প্রবাহে বাধা দেয় বা সংক্রমণ ঘটায়, তাহলে অপারেশনের মাধ্যমে পাথর অপসারণ করতে হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে কিছু আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তবে সবসময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে।
- Open surgery: বড় পাথর হলে অপারেশনের মাধ্যমে সরাসরি পাথর বের করা হয়।
- ESWL (Extracorporeal Shock Wave Lithotripsy): শক ওয়েভ দিয়ে পাথর ভেঙে ছোট করা হয় যাতে প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়। তবে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সবসময় কার্যকর নয়।
- RIRS (Retrograde Intrarenal Surgery): ক্যামেরা ও লেজার ব্যবহার করে কিডনির ভেতরের পাথর ভেঙে বের করা হয়।
- PCNL (Percutaneous Nephrolithotomy): বড় পাথর হলে কিডনিতে ছোট ছিদ্র করে পাথর বের করা হয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে তা নির্ভর করে পাথরের আকার, অবস্থান এবং শিশুর বয়সের উপর।
৯) ফলো‑আপ (Follow-up)
কিডনি পাথর অপসারণের পর শিশুকে নিয়মিত ফলো‑আপে রাখতে হয়। কারণ পাথর আবারও তৈরি হতে পারে। চিকিৎসক সাধারণত আল্ট্রাসনোগ্রাফি, প্রস্রাব পরীক্ষা এবং রক্ত পরীক্ষা করে কিডনির কার্যক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করেন।
- নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে কিডনির অবস্থা দেখা।
- প্রস্রাব পরীক্ষা করে সংক্রমণ আছে কিনা দেখা।
- রক্ত পরীক্ষা করে কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন।
ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় যে শিশুর কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে এবং নতুন পাথর তৈরি হয়নি।
১০) প্রগনোসিস (Prognosis)
শিশুদের কিডনি পাথরের প্রগনোসিস সাধারণত ভালো, যদি সময়মতো চিকিৎসা করা হয়। ছোট পাথর অনেক সময় নিজে থেকেই বের হয়ে যায়। তবে বড় পাথর হলে অপারেশন প্রয়োজন হয়।
- ছোট পাথর — নিজে থেকেই বের হয়ে যায়।
- বড় পাথর — অপারেশন বা আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে অপসারণ করতে হয়।
- বারবার সংক্রমণ — দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে শিশুদের কিডনি পাথর সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব।
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। শিশুর যদি প্রস্রাবে ব্যথা, রক্ত বা বারবার সংক্রমণ হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
- শিশুকে পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো।
- অতিরিক্ত লবণ ও প্রোটিনযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা।
- প্রস্রাবের সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা করা।
- শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া।
অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর কিডনি সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
শেষ কথাঃ (Conclusion)
কিডনি ও মূত্রনালীর পাথর শিশুদের মধ্যে একটি গুরুতর সমস্যা হলেও সময়মতো চিকিৎসা করলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ফলো‑আপের মাধ্যমে শিশুদের কিডনি সুস্থ রাখা যায়। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন ESWL, RIRS ও PCNL শিশুদের কিডনি পাথর সফলভাবে অপসারণে সাহায্য করে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464
