১) মূত্রথলির পাথর কী
মূত্রথলির পাথর হলো প্রস্রাবে থাকা খনিজ পদার্থ যেমন ক্যালসিয়াম, ফসফেট বা ইউরিক অ্যাসিড জমে গিয়ে শক্ত গঠন তৈরি করা। এগুলো মূত্রথলির ভেতরে তৈরি হয় এবং আকারে ছোট থেকে বড় হতে পারে। ছোট পাথর অনেক সময় প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়, কিন্তু বড় পাথর হলে প্রস্রাব আটকে যায়, ব্যথা হয় এবং সংক্রমণ দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও জটিল হতে পারে কারণ তাদের মূত্রথলি ছোট এবং সংবেদনশীল।
২) কারণসমূহ (Causes)
শিশুদের মধ্যে মূত্রথলির পাথর হওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। এগুলো সাধারণত সংক্রমণ, জন্মগত ত্রুটি বা পর্যাপ্ত পানি না খাওয়ার সাথে সম্পর্কিত।
- সংক্রমণ বা প্রদাহ: বারবার ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হলে মূত্রে খনিজ জমে পাথর তৈরি হতে পারে।
- মূত্রথলির অস্বাভাবিক গঠন: জন্মগত ত্রুটির কারণে মূত্রথলির ভেতরে প্রস্রাব জমে থাকে এবং সেখান থেকে পাথর তৈরি হয়।
- পানির অভাব: শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায় এবং তাতে খনিজ জমে পাথর তৈরি হয়।
অতএব, সংক্রমণ প্রতিরোধ, পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো এবং জন্মগত সমস্যার চিকিৎসা শিশুদের মূত্রথলির পাথর প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩) লক্ষণসমূহ (Symptoms)
মূত্রথলির পাথরের লক্ষণ সাধারণত প্রস্রাবের সময় দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে তারা ব্যথা বা অস্বস্তি বোঝাতে না পারলেও কান্না, অস্থিরতা বা প্রস্রাব আটকে যাওয়ার মাধ্যমে অভিভাবকরা বিষয়টি বুঝতে পারেন।
- প্রস্রাব করার সময় কষ্ট বা ব্যথা: পাথর মূত্রথলির ভেতরে থাকলে প্রস্রাব আটকে যায় এবং ব্যথা হয়।
- রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব: পাথর মূত্রথলির দেয়ালে ঘষা লাগালে প্রস্রাবে রক্ত আসতে পারে।
- বারবার সংক্রমণ: মূত্রথলিতে পাথর থাকলে ঘন ঘন ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হয়।
এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত, কারণ দেরি করলে কিডনির কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৪) ডায়াগনসিস (Diagnosis)
মূত্রথলির পাথর নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা করেন। সবচেয়ে সাধারণ হলো আল্ট্রাসনোগ্রাফি, যেখানে মূত্রথলির ভেতরে পাথর দেখা যায়। এছাড়া এক্স-রে, CT Scan এবং প্রস্রাব পরীক্ষা করে সংক্রমণ ও খনিজের মাত্রা দেখা হয়।
- Ultrasound: মূত্রথলির ভেতরে পাথর দেখা যায়।
- X-ray: কিছু ধরণের পাথর এক্স-রেতে দেখা যায়।
- CT Scan: ছোট পাথরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
- Urine test: প্রস্রাবে সংক্রমণ বা খনিজ পদার্থের মাত্রা দেখা হয়।
এই পরীক্ষাগুলো চিকিৎসককে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে শিশুর মূত্রথলিতে পাথর আছে কিনা এবং তার আকার কত বড়।
৫) জটিলতা (Complications)
মূত্রথলির পাথর চিকিৎসা না করলে বা দেরি হলে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।
- প্রস্রাব আটকে যাওয়া
- বারবার সংক্রমণ
- কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া
- শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন কমে যাওয়া
তাই সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত জরুরি।
৬) প্রতিরোধ (Prevention)
মূত্রথলির পাথর প্রতিরোধ করা সম্ভব কিছু জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে। শিশুদের পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া প্রস্রাবের সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা করা এবং খাদ্যাভ্যাসে ফল ও শাকসবজি যোগ করা উচিত।
- শিশুকে পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো।
- ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হলে দ্রুত চিকিৎসা করা।
- অতিরিক্ত লবণ ও প্রোটিনযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা।
অভিভাবকদের সচেতনতা ও সঠিক যত্ন শিশুর জীবনকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
৭) চিকিৎসা (Treatment)
শিশুদের মূত্রথলির পাথরের চিকিৎসা নির্ভর করে পাথরের আকার, অবস্থান, উপসর্গ এবং কিডনির কার্যক্ষমতার উপর। ছোট পাথর অনেক সময় নিজে থেকেই প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়। তবে বড় পাথর হলে চিকিৎসকের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো ব্যথা কমানো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং পাথর অপসারণ করা।
- ছোট পাথর: পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো, ব্যায়াম এবং কিছু ওষুধের মাধ্যমে বের হয়ে যেতে পারে।
- সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ: প্রস্রাবে সংক্রমণ থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
- ব্যথা নিয়ন্ত্রণ: শিশুদের তীব্র ব্যথা হলে চিকিৎসক ব্যথানাশক ওষুধ দেন।
এই প্রাথমিক চিকিৎসা শিশুকে স্বস্তি দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ছোট পাথর নিজে থেকেই বের হয়ে যায়।
৮) সার্জারি ও আধুনিক পদ্ধতি
যদি পাথর বড় হয়, মূত্রথলির প্রবাহে বাধা দেয় বা সংক্রমণ ঘটায়, তাহলে অপারেশনের মাধ্যমে পাথর অপসারণ করতে হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে কিছু আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তবে সবসময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে।
- Open surgery: বড় পাথর হলে অপারেশনের মাধ্যমে সরাসরি পাথর বের করা হয়।
- Endoscopic removal: ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে মূত্রথলির ভেতর থেকে পাথর বের করা হয়।
- Lithotripsy: শক ওয়েভ দিয়ে পাথর ভেঙে ছোট করা হয় যাতে প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে যায়।
শিশুদের ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে তা নির্ভর করে পাথরের আকার, অবস্থান এবং শিশুর বয়সের উপর।
৯) ফলো‑আপ (Follow-up)
মূত্রথলির পাথর অপসারণের পর শিশুকে নিয়মিত ফলো‑আপে রাখতে হয়। কারণ পাথর আবারও তৈরি হতে পারে। চিকিৎসক সাধারণত আল্ট্রাসনোগ্রাফি, প্রস্রাব পরীক্ষা এবং রক্ত পরীক্ষা করে কিডনির কার্যক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করেন।
- নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে মূত্রথলির অবস্থা দেখা।
- প্রস্রাব পরীক্ষা করে সংক্রমণ আছে কিনা দেখা।
- রক্ত পরীক্ষা করে কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন।
ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় যে শিশুর মূত্রথলি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে এবং নতুন পাথর তৈরি হয়নি।
প্রগনোসিস (Prognosis)
শিশুদের মূত্রথলির পাথরের প্রগনোসিস সাধারণত ভালো, যদি সময়মতো চিকিৎসা করা হয়। ছোট পাথর অনেক সময় নিজে থেকেই বের হয়ে যায়। তবে বড় পাথর হলে অপারেশন প্রয়োজন হয়।
- ছোট পাথর — নিজে থেকেই বের হয়ে যায়।
- বড় পাথর — অপারেশন বা আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে অপসারণ করতে হয়।
- বারবার সংক্রমণ — দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে শিশুদের মূত্রথলির পাথর সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব।
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। শিশুর যদি প্রস্রাবে ব্যথা, রক্ত বা বারবার সংক্রমণ হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
- শিশুকে পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো।
- অতিরিক্ত লবণ ও প্রোটিনযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা।
- প্রস্রাবের সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা করা।
- শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া।
অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর মূত্রথলি সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
শেষ কথাঃ (Conclusion)
মূত্রথলির পাথর শিশুদের মধ্যে একটি বিরল সমস্যা হলেও সময়মতো চিকিৎসা করলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ফলো‑আপের মাধ্যমে শিশুদের মূত্রথলি সুস্থ রাখা যায়। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন এন্ডোস্কোপিক সার্জারি ও লিথোট্রিপসি শিশুদের মূত্রথলির পাথর সফলভাবে অপসারণে সাহায্য করে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464
