বিছানায় প্রস্রাব (Nocturnal Enuresis): শিশুদের একটি সাধারণ সমস্যা — ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

বিছানায় প্রস্রাব করা বা Nocturnal Enuresis হলো শিশুদের একটি সাধারণ সমস্যা। সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছর বয়সের মধ্যে অধিকাংশ শিশু এই সমস্যার সমাধান পায়। তবে এর পরেও যদি সমস্যা চলতে থাকে, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এটি কোনো ইচ্ছাকৃত কাজ নয়, বরং কিছু শারীরিক ও মানসিক কারণে ঘটে। শিশুরা অনেক সময় গভীর ঘুমে থাকে, মূত্রথলি পূর্ণ হওয়ার সংকেত বুঝতে পারে না এবং জেগে উঠতে পারে না। আবার কিছু শিশুর মূত্রথলি ছোট থাকে বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে রাতে প্রস্রাবের উৎপাদন বেশি হয়। এসব কারণে বিছানায় প্রস্রাব হতে পারে।

১) বিছানায় প্রস্রাবের কারণসমূহ

বিছানায় প্রস্রাব হওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে।

  • মূত্রথলির অপরিপক্বতা বা ছোট মূত্রথলি: অনেক শিশুর মূত্রথলি রাতে তৈরি হওয়া সমস্ত প্রস্রাব ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট বড় হয় না।
  • হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: রাতে প্রস্রাবের উৎপাদন কমানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টি-ডাইউরেটিক হরমোন (ADH) তৈরি না হওয়া।
  • গভীর ঘুম: কিছু শিশু এত গভীর ঘুমায় যে মূত্রথলি পূর্ণ হওয়ার সংকেত তারা বুঝতে পারে না এবং জেগে উঠতে পারে না।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য: দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে মূত্রথলির উপর চাপ পড়তে পারে।
  • মানসিক চাপ বা উদ্বেগ: নতুন স্কুলে যাওয়া, বড় ভাই-বোন হওয়া বা অন্য কোনো মানসিক চাপ এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা: কদাচিৎ মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) বা অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যা এর কারণ হতে পারে।

২) কারা বেশি আক্রান্ত হয়

Nocturnal Enuresis সাধারণত ৫–৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যায়।

  • ছেলেদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
  • যাদের পরিবারে এই সমস্যা আগে ছিল, তাদের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • মানসিক চাপ বা উদ্বেগে থাকা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

শিশুদের মধ্যে এটি একটি সাধারণ সমস্যা হলেও অভিভাবকদের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

৩) লক্ষণ (Symptoms)

বিছানায় প্রস্রাবের প্রধান লক্ষণ হলো রাতে ঘুমের মধ্যে প্রস্রাব হয়ে যাওয়া।

  • শিশুর বিছানা ভিজে যাওয়া
  • শিশুর আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া
  • মানসিক চাপ বা লজ্জা
  • কিছু ক্ষেত্রে প্রস্রাবের সংক্রমণ

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া।

৪) ডায়াগনসিস (Diagnosis)

Nocturnal Enuresis নির্ণয়ের জন্য সাধারণত বিশেষ কোনো জটিল পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না।

  • শিশুর ইতিহাস নেওয়া — কতবার প্রস্রাব হয়, কখন হয়, অন্য কোনো সমস্যা আছে কিনা।
  • শারীরিক পরীক্ষা — মূত্রথলি ও কিডনির কার্যকারিতা দেখা।
  • Urine routine & culture — সংক্রমণ আছে কিনা দেখা।
  • কিছু ক্ষেত্রে আল্ট্রাসনোগ্রাফি — মূত্রথলি বা কিডনির কাঠামোগত সমস্যা আছে কিনা দেখা।

ডায়াগনসিস নিশ্চিত হলে চিকিৎসক শিশুর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন।

৫) জটিলতা (Complications)

Nocturnal Enuresis সাধারণত বিপজ্জনক নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে।

  • শিশুর আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া
  • মানসিক চাপ বা লজ্জা
  • শিশুর সামাজিক জীবনে প্রভাব পড়া
  • প্রস্রাবের সংক্রমণ

তাই অভিভাবকদের উচিত শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

৬) প্রতিরোধ (Prevention)

Nocturnal Enuresis প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব নয়। তবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সমস্যা কমানো যায়।

  • শিশুকে ঘুমানোর আগে প্রস্রাব করানো
  • সন্ধ্যার পর তরল গ্রহণ কমানো
  • শিশুর খাদ্যাভ্যাসে আঁশযুক্ত খাবার যোগ করে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা
  • শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া

অভিভাবকদের সচেতনতা ও সঠিক যত্ন শিশুর জীবনকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

৬) আচরণগত ও জীবনধারা পরিবর্তন

Nocturnal Enuresis-এর চিকিৎসায় প্রথম ধাপ হলো আচরণগত ও জীবনধারা পরিবর্তন। এগুলো শিশুকে ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণ দেয় এবং মূত্রথলির সংকেত বুঝতে সাহায্য করে।

  • সন্ধ্যার পর তরল নিয়ন্ত্রণ: ঘুমানোর ২–৩ ঘণ্টা আগে থেকে পানি বা অন্য পানীয় কম খেতে দেওয়া। তবে দিনের বেলায় পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানো জরুরি।
  • ঘুমানোর আগে প্রস্রাব: শিশুকে ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে একবার এবং রাতে মাঝখানে জাগিয়ে আরেকবার প্রস্রাব করানো।
  • পুরস্কার পদ্ধতি: বিছানা না ভেজালে বা সফলভাবে টয়লেট ব্যবহার করলে শিশুকে পুরস্কৃত করা। এটি শিশুকে উৎসাহিত করে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা: খাদ্যাভ্যাসে আঁশযুক্ত খাবার যেমন শাকসবজি ও ফল যোগ করে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা।

৭) বেড-ওয়েটিং অ্যালার্ম

বেড-ওয়েটিং অ্যালার্ম হলো একটি বিশেষ ডিভাইস, যা প্রস্রাবের প্রথম ফোঁটা পড়ার সাথে সাথে অ্যালার্ম বাজিয়ে শিশুকে জাগিয়ে তোলে।

এটি শিশুর মস্তিষ্ককে মূত্রথলির সংকেতে সাড়া দিতে প্রশিক্ষণ দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসাগুলোর মধ্যে একটি।

৮) ওষুধ

কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

  • Desmopressin: এটি ADH হরমোনের বিকল্প হিসেবে কাজ করে এবং রাতে প্রস্রাবের উৎপাদন কমায়।
  • Anticholinergic drugs: মূত্রথলির ধারণক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

ওষুধ সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।

৯) ফলো‑আপ (Follow-up)

Nocturnal Enuresis রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী ফলো‑আপ প্রয়োজন।

  • শিশুর প্রস্রাবের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা
  • প্রস্রাবের সংক্রমণ আছে কিনা দেখা
  • শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নজর রাখা
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চেকআপ করানো

ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে চিকিৎসার পর শিশুর সমস্যা কমেছে এবং মানসিকভাবে স্বাভাবিক আছে।

১০) প্রগনোসিস (Prognosis)

Nocturnal Enuresis-এর প্রগনোসিস সাধারণত ভালো। অধিকাংশ শিশু ৫–৭ বছর বয়সের মধ্যে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পায়।

  • শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমস্যা কমে যায়।
  • আচরণগত পরিবর্তন ও বেড-ওয়েটিং অ্যালার্ম ব্যবহার করলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়।
  • ওষুধ প্রয়োগ করলে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসে।

তবে কিছু শিশুর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ (Advice for Parents)

অভিভাবকদের উচিত শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া। বিছানায় প্রস্রাব করা কোনো ইচ্ছাকৃত কাজ নয়, তাই শিশুকে দোষারোপ করা উচিত নয়।

  • শিশুকে উৎসাহিত করা
  • শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ানো
  • শিশুকে শাস্তি না দেওয়া
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করানো

শেষ কথাঃ (Conclusion)

Nocturnal Enuresis হলো শিশুদের একটি সাধারণ সমস্যা, যেখানে তারা রাতে ঘুমের মধ্যে প্রস্রাব করে ফেলে। এটি কোনো ইচ্ছাকৃত কাজ নয়, বরং শারীরিক ও মানসিক কারণে ঘটে। সময়মতো চিকিৎসা, আচরণগত পরিবর্তন, বেড-ওয়েটিং অ্যালার্ম এবং ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ শিশুই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পায়। অভিভাবকদের সচেতনতা ও মানসিক সমর্থন শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464