মেজেন্টারিক সিস্ট (Mesenteric Cyst): ৬টি গুরুত্বপূর্ণ দিক — পরিচিতি, কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও জটিলতা

মেজেন্টারিক সিস্ট হলো পেটের মেজেন্টেরিয়াম—যা ছোট বা বড় অন্ত্রের রক্তনালী ও চর্বিযুক্ত পাতলা ঝিল্লি—এর মধ্যে গঠিত অস্বাভাবিক তরলভরা একটি সিস্ট। শিশুদের মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও জন্মগত কারণেও হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকর নয়, কিন্তু সিস্ট বড় হলে পেট ফুলে যাওয়ার অনুভূতি, অস্বস্তি ও ব্যথা তৈরি হতে পারে, কখনও বমিও হতে পারে। সময়মতো সঠিক ডায়াগনোসিস ও চিকিৎসা হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব।

মেজেন্টারিক সিস্ট হলো একটি বিরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ শিশু রোগ, যেখানে অন্ত্রকে ধরে রাখা পাতলা ঝিল্লি বা মেজেন্টেরিয়ামের মধ্যে তরল জমে একটি থলি-সদৃশ গঠন তৈরি হয়। মেজেন্টেরিয়াম মূলত অন্ত্রের রক্তনালী, লিম্ফ্যাটিক চ্যানেল এবং চর্বিযুক্ত টিস্যু ধারণ করে। যখন এই কাঠামোর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, তখন সিস্ট তৈরি হয়। ছোট সিস্ট অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে, কিন্তু বড় হলে পেট ফুলে যায়, অস্বস্তি হয় এবং শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায়।

১) পরিচিতি

মেজেন্টারিক সিস্ট মূলত মেজেন্টেরিয়ামের ভেতরে তরল জমে থলি-সদৃশ গঠন তৈরি হলে দেখা যায়। এটি একক বা একাধিক হতে পারে, দেয়াল সাধারণত পাতলা এবং ভেতরে serous, chylous বা hemorrhagic তরল থাকতে পারে। ছোট সিস্ট দীর্ঘদিন নিরব থাকতে পারে; বড় সিস্ট ধীরে ধীরে পেটের আকার বাড়ায়, চাপজনিত অস্বস্তি দেয় এবং আশপাশের অন্ত্রকে চাপ দিয়ে অবস্ট্রাকশনের মতো উপসর্গ তৈরি করতে পারে।

  • প্রকৃতি: মেজেন্টেরিয়ামের মধ্যে তরলভরা থলি-আকৃতির গঠন
  • বয়স: শিশুদের মধ্যে বিরল, তবু জন্মগত কারণেও হতে পারে
  • প্রভাব: ছোট হলে ক্ষতিকর নয়, বড় হলে পেট ফোলা ও ব্যথা

২) কারণ

মেজেন্টারিক সিস্টের প্রধান কারণ হলো জন্মগত ত্রুটি। ভ্রূণ অবস্থায় লিম্ফ্যাটিক বা রক্তনালীর বিকাশে সমস্যা হলে সিস্ট তৈরি হতে পারে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সংক্রমণ বা স্থানীয় আঘাতের পর প্রতিক্রিয়ায়ও সিস্ট গঠন হয়। লিম্ফ্যাটিক চ্যানেলগুলোতে তরল জমে থেকে ধীরে ধীরে সিস্ট বড় হতে পারে। তাই এটি কখনও জন্মগত, আবার কখনও অর্জিত সমস্যার কারণে দেখা দেয়।

কারণ সাধারণত জন্মগত—মেজেন্টেরিয়ামের লিম্ফ্যাটিক বা রক্তনালীর বিকাশজনিত ত্রুটিতে সিস্ট তৈরি হয়। এছাড়া কম ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সংক্রমণ বা স্থানীয় আঘাতের পর প্রতিক্রিয়ায় সিস্ট গঠন হতে পারে। লিম্ফ্যাটিক চ্যানেলগুলোর অবরোধ বা অস্বাভাবিক যোগাযোগের কারণে তরল জমে থেকে ধীরে ধীরে সিস্ট বড় হতে পারে।

  • জন্মগত: লিম্ফ্যাটিক/রক্তনালীর বিকাশজনিত ত্রুটি
  • সংক্রমণ: পূর্ববর্তী ইনফেকশনের পর প্রতিক্রিয়াজনিত সিস্ট
  • আঘাত: স্থানীয় ট্রমার পর তরল জমে সিস্ট গঠন

৩) লক্ষণ

লক্ষণ সিস্টের আকার ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। ছোট সিস্ট সাধারণত কোনো উপসর্গ দেয় না। বড় হলে পেট ফুলে যায়, চাপজনিত ব্যথা হয় এবং শিশুর খাওয়ার পর অস্বস্তি দেখা দেয়। অনেক সময় বমি হয়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে কান্না ও অস্থিরতা দেখা যায়, বড় শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী পেট ব্যথা ও মাঝে মাঝে পেট ফুলে থাকা দেখা যায়। যদি সিস্ট পাক খেয়ে যায় (torsion) বা অন্ত্রকে চেপে ধরে, তবে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, বমি এবং শকের মতো অবস্থা তৈরি হতে পারে।

উপসর্গ সিস্টের আকার ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। সাধারণ অভিযোগ হলো পেট ফুলে যাওয়ার অনুভূতি, চাপ বা টান লাগা ধরনের পেট ব্যথা, মাঝে মাঝে বমি। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে খাওয়ার পর অস্বস্তি ও কান্না, বড় শিশুদের ক্ষেত্রে ক্রনিক পেট ব্যথা ও মাঝে মাঝে পেট ফুলে থাকা দেখা যেতে পারে। অবস্ট্রাকশন বা টরশন হলে উপসর্গ তীব্র হয়ে হঠাৎ বমি, তীব্র ব্যথা ও পেট ফোলার লক্ষণ দেখা দেয়।

  • পেট ফোলা: দৃশ্যমান/অনুভূত স্ফীতি
  • পেট ব্যথা: চাপজনিত বা ক্র্যাম্পি ব্যথা
  • বমি: বিশেষত বড় সিস্ট বা অবস্ট্রাকশনে
  • বয়সভেদে ভিন্নতা: ছোটদের কান্না/অস্বস্তি, বড়দের ক্রনিক ব্যথা

৪) পরীক্ষা‑নিরীক্ষা (Diagnosis)

ডায়াগনোসিসে সবচেয়ে কার্যকর হলো আল্ট্রাসাউন্ড (USG)। এতে সিস্টের আকার, অবস্থান ও ভেতরে তরল আছে কি না তা বোঝা যায়। বড় বা জটিল সিস্টের ক্ষেত্রে CT scan বা MRI করা হয়, যাতে সিস্টের সঠিক অবস্থান, পার্শ্ববর্তী অঙ্গের সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য জটিলতা বোঝা যায়। শারীরিক পরীক্ষায় ডাক্তার পেটে নরম, মোবাইল, সিস্টিক মস অনুভব করতে পারেন।

প্রাথমিকভাবে আল্ট্রাসাউন্ড (USG) হলো সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পরীক্ষা—এতে তরলভরা সিস্ট, দেয়ালের পুরুত্ব, সেপটেশন আছে কি না তা বোঝা যায়। বড় বা জটিল সিস্ট, কিংবা শল্যচিকিৎসা পরিকল্পনার আগে CT scan বা MRI করা হয় যাতে সিস্টের অবস্থান, পার্শ্ববর্তী অঙ্গের সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য অবস্ট্রাকশন/টরশন ভালোভাবে মূল্যায়ন করা যায়। শারীরিক পরীক্ষায় নরম, মোবাইল, সিস্টিক মস পাওয়া যেতে পারে।

  • Ultrasound (USG): তরলভরা সিস্ট নির্ণয়ে প্রথম পছন্দ
  • CT/MRI: বড়/জটিল সিস্ট ও প্রি‑অপারেটিভ ম্যাপিং
  • ক্লিনিক্যাল ফাইন্ডিং: নরম সিস্টিক মস, পেট ফোলা

৫) চিকিৎসা

চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো সিস্ট সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা। ছোট কিন্তু উপসর্গযুক্ত সিস্টেও অপসারণ করা হয়। যদি সিস্ট অন্ত্রের সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে বা রক্তসরবরাহের কারণে আলাদা করা নিরাপদ না হয়, তবে অন্ত্রের একটি অংশসহ সিস্ট অপসারণ করা হয় (segmental resection)। একজন শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞ অপারেশনের সময়কাল ও ফলাফল সম্পর্কে পরামর্শ দেন এবং অপারেশন পরিচালনা করেন। সময়মতো চিকিৎসা করলে শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব।

চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো সম্পূর্ণ সিস্ট অপসারণ (complete excision) করে উপসর্গ ও জটিলতা প্রতিরোধ। ছোট কিন্তু উপসর্গযুক্ত সিস্টেও অপসারণ করা হয়। সিস্ট যদি অন্ত্রের সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে বা রক্তসরবরাহের কারণে আলাদা করা নিরাপদ না হয়, তবে সংশ্লিষ্ট অন্ত্রের একটি ছোট অংশসহ সিস্ট অপসারণ (segmental resection) করা হয়। সিদ্ধান্ত, সময়কাল ও প্রত্যাশিত ফলাফল বিষয়ে একজন শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞ বিস্তারিত পরামর্শ দেন এবং অপারেশন পরিচালনা করেন।

  • Complete excision: উপসর্গযুক্ত/বড় সিস্টে মানদণ্ড
  • Segmental resection: অন্ত্রের সাথে সংযুক্ত থাকলে
  • শিশু সার্জন: পরিকল্পনা, অপারেশন ও ফলো‑আপে নেতৃত্ব

৬) জটিলতা (Complications)

মেজেন্টারিক সিস্টে সংক্রমণ হলে ব্যথা ও জ্বর বাড়ে। রক্তক্ষরণ হলে হঠাৎ পেট ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দেয়। টরশন হলে রক্তচলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং জরুরি অবস্থা তৈরি হয়। সম্পূর্ণ অপসারণ না হলে পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে। তাই অপারেশনে পরিষ্কারভাবে সিস্ট অপসারণ করা জরুরি।মেজেন্টারিক সিস্টে সংক্রমণ হলে ব্যথা ও জ্বর বাড়ে, রক্তক্ষরণ হলে হঠাৎ পেট ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। টরশন (পাক খাওয়া) হলে রক্তচলাচল ব্যাহত হয়ে তীব্র ব্যথা ও ইমার্জেন্সি তৈরি হয়। সম্পূর্ণ অপসারণ না হলে কিছু ক্ষেত্রে পুনরায় ফিরে আসার (recurrence) ঝুঁকি থাকে, তাই অপারেশনে পরিষ্কার মার্জিন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

  • ইনফেকশন: ব্যথা, জ্বর, স্থানীয় প্রদাহ
  • রক্তক্ষরণ: আকস্মিক ব্যথা/দুর্বলতা
  • টরশন: তীব্র ব্যথা, জরুরি অবস্থা
  • পুনরাবৃত্তি: অসম্পূর্ণ অপসারণে সম্ভাবনা

শেষ কথাঃ

মেজেন্টারিক সিস্ট শিশুদের মধ্যে বিরল হলেও উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না। আল্ট্রাসাউন্ডে দ্রুত শনাক্ত করে সঠিক সময়ে শল্যচিকিৎসা করলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব। সিস্ট বড় হওয়া, পেট ব্যথা বা হঠাৎ বমি—এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শিশুসরজারি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সম্পূর্ণ অপসারণের পর অধিকাংশ শিশু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়।মেজেন্টারিক সিস্ট শিশুদের মধ্যে বিরল হলেও উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না। আল্ট্রাসাউন্ডে দ্রুত শনাক্ত করে সঠিক সময়ের মধ্যে শল্যচিকিৎসা করলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব। সিস্ট বড় হওয়া, পেট ব্যথা/বমি বা হঠাৎ পেট ফোলা—এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শিশুসরজারি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সম্পূর্ণ অপসারণের পর অধিকাংশ শিশু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়।

মনে রাখুন: দীর্ঘদিনের পেট ফোলা বা পুনঃপুনঃ পেট ব্যথা শিশুদের ক্ষেত্রে গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করা দরকার—সময়মতো পদক্ষেপই নিরাপত্তা। 250464