হাইপোসপেডিয়াস (Hypospadias): ৮টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

হাইপোসপেডিয়াস (Hypospadias) হলো একটি জন্মগত ত্রুটি, যেখানে ছেলেশিশুর প্রস্রাবের ছিদ্রটি লিঙ্গের মাথার ডগায় না থেকে নিচের দিকে থাকে — কখনও লিঙ্গের মাঝখানে, কখনও অণ্ডথলির কাছাকাছি, এমনকি পেরিনিয়াম পর্যন্তও হতে পারে। এটি শিশুর প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহে সমস্যা তৈরি করে এবং ভবিষ্যতে যৌনজীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। হাইপোসপেডিয়াসের প্রকৃতি ও জটিলতা নির্ভর করে প্রস্রাবের ছিদ্রের অবস্থান কতটা নিচে এবং লিঙ্গে বাঁক আছে কিনা তার ওপর।

১) কারণ (Causes)

হাইপোসপেডিয়াসের সঠিক কারণ সবসময় জানা যায় না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু জেনেটিক ফ্যাক্টর, গর্ভাবস্থায় হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং পরিবেশগত কিছু বিষয়ের কারণে এটি হতে পারে। গর্ভাবস্থায় যদি টেস্টোস্টেরনের উৎপাদন বা কার্যকারিতা কমে যায়, তাহলে শিশুর ইউরেথ্রার স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। এছাড়া কিছু ওষুধ, কীটনাশক, বা হরমোন-প্রভাবিত খাবারও ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

  • জেনেটিক ফ্যাক্টর
  • গর্ভাবস্থায় হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
  • পরিবেশগত প্রভাব (কেমিক্যাল, কীটনাশক)
  • টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি

২) প্রকারভেদ (Types)

হাইপোসপেডিয়াসকে প্রস্রাবের ছিদ্রের অবস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। নিচের চিত্রে বিভিন্ন অবস্থান দেখানো হয়েছে — Normal থেকে শুরু করে Glanular, Coronal, Distal Penile, Midshaft, Proximal Penile, Penoscrotal, Scrotal এবং Perineal পর্যন্ত। অবস্থান যত নিচের দিকে, তত বেশি জটিলতা এবং তত বেশি অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ।

  • Glanular: লিঙ্গের মাথার নিচে
  • Coronal: মাথার গোড়ায়
  • Distal/Midshaft: লিঙ্গের মাঝখানে
  • Proximal/Scrotal: অণ্ডথলির কাছাকাছি
  • Perineal: অণ্ডথলি ও পায়ুপথের মাঝখানে

৩) লক্ষণ (Symptoms)

হাইপোসপেডিয়াস চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রস্রাবের ছিদ্রের অবস্থান লক্ষ্য করা। এটি সাধারণত লিঙ্গের নিচে থাকে। এছাড়া লিঙ্গ বাঁকা হয়ে যাওয়া (Chordee), লিঙ্গের মাথায় অতিরিক্ত চামড়া (Hooding), এবং প্রস্রাবের সময় নিচের দিকে প্রস্রাব পড়া — এসব লক্ষণ দেখা যায়। অনেক সময় শিশুর প্রস্রাবের প্রবাহ দুর্বল হয় এবং সোজা না হয়ে নিচের দিকে পড়ে।

  • প্রস্রাবের ছিদ্র নিচে অবস্থান করে
  • লিঙ্গ বাঁকা হয়ে যায় (Chordee)
  • লিঙ্গের মাথায় অতিরিক্ত চামড়া (Hooding)
  • প্রস্রাব সোজা না হয়ে নিচের দিকে পড়ে
  • প্রস্রাবের প্রবাহ দুর্বল

৪) চিকিৎসা (Treatment)

হাইপোসপেডিয়াসের একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা হলো অপারেশন। এই অপারেশন শিশুর প্রস্রাবের ছিদ্রকে সঠিক জায়গায় নিয়ে আসে এবং লিঙ্গের বাঁক (Chordee) ঠিক করে। অপারেশন সাধারণত শিশুর বয়স ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে করা হয়, কারণ এই বয়সে শিশুর টিস্যু নমনীয় থাকে এবং সার্জিকাল ফলাফল ভালো হয়। অপারেশনের ধরণ নির্ভর করে হাইপোসপেডিয়াসের ধরন ও জটিলতার ওপর — কখনও এক ধাপে, কখনও দুই ধাপে করা হয়। অপারেশন না করলে ভবিষ্যতে প্রস্রাব, যৌনজীবন এবং সন্তান ধারণে সমস্যা হতে পারে।

  • অপারেশনই একমাত্র চিকিৎসা
  • বয়স ১–২ বছরের মধ্যে অপারেশন করা ভালো
  • Chordee ঠিক করা হয়
  • প্রস্রাবের ছিদ্র সঠিক স্থানে নিয়ে আসা হয়
  • এক বা দুই ধাপে অপারেশন হয়

৫) অপারেশন পদ্ধতি ও যত্ন

হাইপোসপেডিয়াসের অপারেশন প্রায় ৩০০ রকম পদ্ধতিতে করা যায়। কোন পদ্ধতি ব্যবহার হবে তা নির্ভর করে ছিদ্রের অবস্থান, লিঙ্গের বাঁক, এবং সার্জনের অভিজ্ঞতার ওপর। অপারেশনের পর প্রস্রাবের রাস্তায় একটি ক্যাথেটার রাখা হয়, যা সাধারণত ৭–১২ দিন পর খোলা হয়। এরপর ১২–১৪ দিন থেকে একটি নতুন প্রস্রাবের রাস্তা তৈরি করে সেটিকে স্থায়ীভাবে রাখতে হয়। অপারেশনের পর শিশুকে পরিষ্কার রাখতে হয়, ইনফেকশন যেন না হয় তা নিশ্চিত করতে হয়, এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলো‑আপ করতে হয়।

  • ৩০০+ পদ্ধতি রয়েছে
  • ছিদ্রের অবস্থান ও বাঁক অনুযায়ী পদ্ধতি নির্ধারণ
  • অপারেশনের পর ক্যাথেটার রাখা হয়
  • নতুন প্রস্রাবের রাস্তা তৈরি করা হয়
  • পরিষ্কার‑পরিচ্ছন্নতা ও ফলো‑আপ জরুরি

৬) জটিলতা (Complications)

অপারেশনের পর কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন সেলাইয়ের জায়গায় ছোট ছিদ্র (ফিস্টুলা), প্রস্রাবের পথ সরু হয়ে যাওয়া (স্টেনোসিস), বা ইনফেকশন। এসব সমস্যা হলে পুনরায় অপারেশন লাগতে পারে। তবে অভিজ্ঞ সার্জনের হাতে এবং সঠিক যত্নে এসব জটিলতা অনেকাংশে এড়ানো যায়। অভিভাবকদের উচিত অপারেশনের পর শিশুর প্রস্রাবের ধারা, ব্যথা বা অস্বস্তি লক্ষ্য করা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা।

  • ফিস্টুলা (ছোট ছিদ্র)
  • স্টেনোসিস (প্রস্রাবের পথ সরু)
  • ইনফেকশন
  • পুনরায় অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে

৭) অভিভাবকদের জন্য সতর্কতা ও পরামর্শ

হাইপোসপেডিয়াসে আক্রান্ত শিশুর মুসলমানী (circumcision) করা যাবে না, কারণ অপারেশনের সময় লিঙ্গের চামড়া দরকার হয়। অনেক অভিভাবক না জেনে আগে মুসলমানী করিয়ে ফেলেন, ফলে পরবর্তী অপারেশন জটিল হয়ে যায়। তাই হাইপোসপেডিয়াস সন্দেহ হলে আগে শিশুসার্জনের পরামর্শ নিতে হবে। অপারেশনের আগে শিশুকে খালি পেটে রাখতে হয়, এবং অপারেশনের পর পরিষ্কার‑পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হয়। অভিভাবকদের উচিত অপারেশনের প্রতিটি ধাপে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা।

  • মুসলমানী আগে করা যাবে না
  • অপারেশনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
  • অপারেশনের দিন শিশুকে খালি পেটে রাখুন
  • পরিষ্কার‑পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
  • ফলো‑আপে নিয়মিত থাকুন

৮) অপারেশন সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর (FAQs)

অভিভাবকদের মনে অনেক প্রশ্ন থাকে হাইপোসপেডিয়াস অপারেশন নিয়ে। অপারেশন সাধারণত ১–২ ঘণ্টা সময় লাগে। কসমেটিক সেলাই দেওয়া হয়, তাই দাগ থাকে না। সেলাই কাটার প্রয়োজন হয় না। অপারেশনের পর শিশুর প্রস্রাবের জন্য ক্যাথেটার রাখা হয়, যা ৭–১২ দিন পর খোলা হয়। ভবিষ্যতে শিশুর যৌন সমস্যা বা সন্তান ধারণে সমস্যা হয় না, বরং অপারেশন না করলে এসব সমস্যা হতে পারে। অপারেশন করার সময় অজ্ঞান দেওয়া হয়, যা অভিজ্ঞ এনেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিরাপদভাবে করা হয়।

  • অপারেশন সময়: ১–২ ঘণ্টা
  • কসমেটিক সেলাই দেওয়া হয়, দাগ থাকে না
  • সেলাই কাটার প্রয়োজন নেই
  • ক্যাথেটার ৭–১২ দিন পর খোলা হয়
  • ভবিষ্যতে যৌন সমস্যা হয় না
  • অজ্ঞান নিরাপদভাবে দেওয়া হয়

শেষ কথাঃ

হাইপোসপেডিয়াস একটি জন্মগত সমস্যা হলেও সময়মতো চিকিৎসা করলে শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাভাবিক থাকে। অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রস্রাবের ছিদ্রের অবস্থান লক্ষ্য করা এবং সন্দেহ হলে দ্রুত শিশুসার্জনের পরামর্শ নেওয়া। মুসলমানী আগে না করিয়ে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী অপারেশন করানো উচিত। সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং সঠিক ফলো‑আপই শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464