জন্মগত ডায়াফ্রামেটিক হার্নিয়া (Congenital Diaphragmatic Hernia): নবজাতকের গুরুতর শ্বাসকষ্টের কারণ — ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দিক

Congenital Diaphragmatic Hernia (CDH) হলো একটি জন্মগত অস্বাভাবিকতা, যেখানে পেটের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন পাকস্থলী, অন্ত্র, লিভার ইত্যাদি ডায়াফ্রামের ফাঁক দিয়ে বুকে উঠে আসে। ডায়াফ্রাম হলো বুক ও পেটের মধ্যে বিভাজনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ মাংসপেশী, যা শ্বাস-প্রশ্বাসে সাহায্য করে। ভ্রূণ অবস্থায় ডায়াফ্রাম পুরোপুরি গঠিত না হলে এই হার্নিয়া হয়। CDH একটি জীবন-ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা, কারণ এতে ফুসফুসের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে নবজাতক জন্মের পরপরই শ্বাসকষ্টে ভোগে। অনেক সময় গর্ভকালীন আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে CDH শনাক্ত করা যায়।

১) ডায়াফ্রামের ভূমিকা ও CDH-এর উৎপত্তি

ডায়াফ্রাম হলো একটি গম্বুজ আকৃতির মাংসপেশী, যা বুকের গহ্বর (thoracic cavity) ও পেটের গহ্বর (abdominal cavity) আলাদা করে। শ্বাস নেওয়ার সময় ডায়াফ্রাম নিচে নেমে যায় এবং ফুসফুসে বাতাস প্রবেশ করে। ভ্রূণ অবস্থায় ডায়াফ্রাম ধীরে ধীরে গঠিত হয়। সাধারণত গর্ভাবস্থার ৮ম থেকে ১০ম সপ্তাহে ডায়াফ্রাম সম্পূর্ণ হয়। কিন্তু যদি কোনো কারণে ডায়াফ্রামের গঠন অসম্পূর্ণ থাকে, তখন একটি ফাঁক থেকে যায়। সেই ফাঁক দিয়ে পেটের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বুকে উঠে আসে। একে Congenital Diaphragmatic Hernia বলা হয়।

২) প্রধান ধরণ (Types)

CDH-এর দুটি প্রধান ধরণ রয়েছে:

  • Bochdalek hernia: সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সাধারণত ডায়াফ্রামের পেছনের দিকে হয়। প্রায় ৮০–৯০% ক্ষেত্রে এই ধরণ পাওয়া যায়।
  • Morgagni hernia: তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। এটি ডায়াফ্রামের সামনের দিকে হয়।

Bochdalek hernia সাধারণত গুরুতর হয়, কারণ এতে অন্ত্র, পাকস্থলী এমনকি লিভারও বুকে উঠে আসতে পারে। Morgagni hernia তুলনামূলকভাবে কম গুরুতর হলেও চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

৩) উপসর্গ (Symptoms)

CDH-এর উপসর্গ নবজাতক ও ছোট শিশুদের মধ্যে ভিন্নভাবে দেখা যায়।

  • নবজাতকের ক্ষেত্রে: জন্মের সাথে সাথেই শ্বাসকষ্ট, ঠোঁট ও ত্বক নীলচে হয়ে যাওয়া (cyanosis), পেট চ্যাপ্টা বা ছোট দেখা যাওয়া।
  • ছোট বাচ্চার ক্ষেত্রে: ঘনঘন ঠান্ডা-কাশি, শ্বাসকষ্ট, খাওয়ার সমস্যা।

নবজাতকের ক্ষেত্রে CDH একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। জন্মের পরপরই শ্বাস-প্রশ্বাসের সাপোর্ট প্রয়োজন হয়।

৪) ডায়াগনসিস (Diagnosis)

CDH নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।

  • এক্স-রে: বুকের এক্স-রেতে পেটের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখা যায়।
  • আল্ট্রাসনোগ্রাফি: গর্ভকালীন সময়ে CDH শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
  • CT Scan: আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

গর্ভকালীন সময়ে CDH শনাক্ত হলে শিশুর জন্মের পরপরই বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।

৫) জটিলতা (Complications)

CDH একটি গুরুতর জন্মগত সমস্যা। এর ফলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।

  • ফুসফুসের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়
  • শ্বাসকষ্ট ও অক্সিজেনের অভাব
  • Pulmonary hypertension (ফুসফুসে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া)
  • হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা কমে যাওয়া
  • জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়া

তাই CDH একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি হিসেবে বিবেচিত হয়। জন্মের পরপরই শিশুকে ICU-তে ভর্তি করে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাপোর্ট দেওয়া হয়।

৬) প্রতিরোধ (Prevention)

CDH একটি জন্মগত সমস্যা, তাই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করলে CDH শনাক্ত করা যায়। এতে শিশুর জন্মের পরপরই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।

  • গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি
  • ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থায় বিশেষায়িত চিকিৎসকের পরামর্শ
  • শিশুর জন্মের পরপরই ICU-তে ভর্তি

অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ CDH-এর জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।

৬) চিকিৎসা (Treatment)

Congenital Diaphragmatic Hernia (CDH) একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। নবজাতক জন্মের পরপরই শ্বাসকষ্টে ভোগে, তাই প্রথমেই শ্বাস-প্রশ্বাসের সাপোর্ট দেওয়া হয়। শিশুকে সাধারণত Neonatal Intensive Care Unit (NICU)-তে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা, ফুসফুসে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছানো এবং হার্নিয়া সার্জারির মাধ্যমে ঠিক করা।

  • জন্মের পরপরই শ্বাস-প্রশ্বাসের সাপোর্ট (ventilator)
  • অক্সিজেন থেরাপি
  • রক্তচাপ ও হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ
  • সংক্রমণ প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ

৭) সার্জারি (Surgery)

CDH-এর definitive treatment হলো সার্জারি। সার্জারির সময় ডায়াফ্রামের ফাঁক বন্ধ করা হয় এবং পেটের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে তাদের স্বাভাবিক জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সার্জারির ধরন নির্ভর করে হার্নিয়ার অবস্থান ও আকারের উপর।

  • Thoracotomy: বুকের দিক দিয়ে সার্জারি করা হয়।
  • Thoracoscopy: আধুনিক minimally invasive surgery, যেখানে ছোট ছিদ্র দিয়ে ক্যামেরা ও যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।
  • Laparotomy: পেটের দিক দিয়ে সার্জারি করা হয়।

সার্জারির পর শিশুকে ICU-তে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

৮) ICU ব্যবস্থাপনা (ICU Management)

CDH রোগীদের জন্য ICU ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • Ventilator support — শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে
  • ECMO (Extracorporeal Membrane Oxygenation) — গুরুতর ক্ষেত্রে ফুসফুসের কাজ সাময়িকভাবে মেশিনের মাধ্যমে করানো হয়
  • Pulmonary hypertension নিয়ন্ত্রণে ওষুধ
  • রক্তচাপ ও হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ

ECMO একটি জটিল প্রযুক্তি, যা গুরুতর CDH রোগীদের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে। তবে এটি বিশেষায়িত হাসপাতালে পাওয়া যায়।

৯) ফলো‑আপ (Follow-up)

সার্জারির পর শিশুর দীর্ঘমেয়াদী ফলো‑আপ প্রয়োজন।

  • ফুসফুসের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ
  • হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা
  • শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন পর্যবেক্ষণ
  • নিয়মিত চেকআপ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

CDH রোগীদের অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্ট বা ফুসফুসের সমস্যা থাকতে পারে। তাই ফলো‑আপ অত্যন্ত জরুরি।

১০) প্রগনোসিস (Prognosis)

CDH-এর প্রগনোসিস নির্ভর করে হার্নিয়ার আকার, ফুসফুসের বিকাশ এবং চিকিৎসার সময়ের উপর।

  • ছোট হার্নিয়া হলে ফল ভালো হয়
  • বড় হার্নিয়া হলে জটিলতা বেশি হয়
  • ECMO ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ঝুঁকি বেশি থাকে

সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও সার্জারি করলে শিশুর জীবন স্বাভাবিক হতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্ট বা ফুসফুসের সমস্যা থাকতে পারে।

১১) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ (Advice for Parents)

অভিভাবকদের উচিত CDH সম্পর্কে সচেতন থাকা। গর্ভকালীন সময়ে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করলে CDH শনাক্ত করা যায়। শিশুর জন্মের পরপরই বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি।

  • গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি
  • শিশুর জন্মের পরপরই ICU-তে ভর্তি
  • সার্জারির পর নিয়মিত ফলো‑আপ
  • শিশুকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া

শেষ কথাঃ (Conclusion)

Congenital Diaphragmatic Hernia (CDH) হলো একটি গুরুতর জন্মগত সমস্যা, যেখানে পেটের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ডায়াফ্রামের ফাঁক দিয়ে বুকে উঠে আসে। এটি নবজাতকের শ্বাসকষ্টের প্রধান কারণগুলোর একটি। সময়মতো চিকিৎসা, ICU ব্যবস্থাপনা, ECMO এবং সার্জারির মাধ্যমে শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ CDH রোগীদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464