এর ফলে অগ্ন্যাশয়ের রস উল্টো পথে পিত্তনালীতে প্রবেশ করে নালীটিকে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল করে দেয়, যার কারণে সিস্ট তৈরি হয়। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি সংক্রমণ, লিভারের ক্ষতি এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নবজাতক থেকে শুরু করে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এটি দেখা দিতে পারে এবং অভিভাবকদের জন্য এটি একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
১) পরিচিতি
কোলেডোকাল সিস্ট হলো একটি বিরল কিন্তু গুরুতর জন্মগত রোগ, যা পিত্তনালীর স্বাভাবিক গঠনকে ব্যাহত করে। সাধারণত জন্মের সময় থেকেই এর উপস্থিতি থাকে, তবে অনেক সময় শিশু বড় হওয়ার পর উপসর্গ প্রকাশ পায়। সিস্টের কারণে পিত্তরস জমে গিয়ে লিভারে চাপ সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে লিভারের কার্যকারিতা নষ্ট করে। এটি শিশুদের মধ্যে জন্ডিস, পেটব্যথা, ফোলাভাব এবং হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। চিকিৎসা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এটি সিরোসিস বা পিত্তনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিকভাবে নির্ণয় ও চিকিৎসা করা অত্যন্ত জরুরি।
- প্রকৃতি: জন্মগত অস্বাভাবিকতা
- প্রভাব: পিত্তরস জমে গিয়ে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- ঝুঁকি: চিকিৎসা না করলে সিরোসিস ও ক্যান্সার
২) কারণ (Causes)
কোলেডোকাল সিস্ট সাধারণত জন্মগতভাবে হয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ হলো পিত্তনালী এবং অগ্ন্যাশয়ের নালীর সংযোগ অস্বাভাবিক হওয়া। স্বাভাবিক অবস্থায় পিত্তনালী ও অগ্ন্যাশয়ের নালী আলাদা থাকে এবং তাদের কার্যকারিতা পৃথক হয়। কিন্তু অস্বাভাবিক সংযোগের কারণে অগ্ন্যাশয়ের রস উল্টো পথে পিত্তনালীতে প্রবেশ করে। এতে পিত্তনালীর দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে সিস্ট তৈরি করে। এছাড়া জেনেটিক ত্রুটি বা জন্মগত বিকাশজনিত সমস্যাও এর সাথে যুক্ত থাকতে পারে। যদিও সুনির্দিষ্ট কারণ সবসময় জানা যায় না, তবে এটি স্পষ্ট যে জন্মগত অস্বাভাবিকতা ও অগ্ন্যাশয়ের রসের অস্বাভাবিক প্রবাহই মূল কারণ।
- অস্বাভাবিক সংযোগ: পিত্তনালী ও অগ্ন্যাশয়ের নালীর অস্বাভাবিক সংযোগ
- অগ্ন্যাশয়ের রস: উল্টো পথে প্রবেশ করে পিত্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করে
- জেনেটিক ত্রুটি: জন্মগত বিকাশজনিত সমস্যা
৩) উপসর্গ (Symptoms)
কোলেডোকাল সিস্টের উপসর্গ সাধারণত শিশুদের মধ্যে দেখা যায়, তবে অনেক সময় বড় হওয়ার পরও প্রকাশ পেতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ হলো পেটব্যথা, বিশেষত ওপরের ডান দিকে। সিস্ট বড় হলে পেটের ডান পাশে ফোলাভাব বা চাকা অনুভূত হতে পারে। জন্ডিস একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, যেখানে শিশুর ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যায়। এছাড়া ফ্যাকাশে মল এবং গাঢ় রঙের প্রস্রাব দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে অভিভাবকদের উচিত দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, কারণ সময়মতো চিকিৎসা না করলে লিভার স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- পেটব্যথা: বিশেষত ওপরের ডান দিকে
- ফোলাভাব: বড় সিস্টে পেটের ডান পাশে চাকা অনুভূত হওয়া
- জন্ডিস: ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া
- ফ্যাকাশে মল: বাইল প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে
- গাঢ় প্রস্রাব: লিভারে পিত্ত জমে থাকার কারণে
৪) পরীক্ষা ও নির্ণয় (Diagnosis)
কোলেডোকাল সিস্ট নির্ণয়ের জন্য একাধিক পরীক্ষা প্রয়োজন হয়, কারণ প্রাথমিকভাবে এটি সাধারণ জন্ডিস বা পেটব্যথার মতো মনে হতে পারে। প্রথমে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয়, যেখানে লিভার ও পিত্তনালীর গঠন দেখা যায় এবং সিস্টের উপস্থিতি বোঝা যায়। MRCP (Magnetic Resonance Cholangiopancreatography) একটি উন্নত ইমেজিং পরীক্ষা, যা পিত্তনালী ও অগ্ন্যাশয়ের নালীর বিস্তারিত ছবি দেয় এবং সিস্টের আকার ও অবস্থান নির্ণয়ে সহায়ক। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারের কার্যকারিতা বোঝা যায় এবং জন্ডিসের মাত্রা নির্ণয় করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় শিশুর কোলেডোকাল সিস্ট আছে কিনা এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা করা যায়।
- আল্ট্রাসনোগ্রাফি: লিভার ও পিত্তনালীর গঠন দেখা
- MRCP: পিত্তনালী ও অগ্ন্যাশয়ের নালীর বিস্তারিত ছবি
- রক্ত পরীক্ষা: লিভার ফাংশন ও জন্ডিসের মাত্রা নির্ণয়
৫) চিকিৎসা (Treatment)
কোলেডোকাল সিস্টের চিকিৎসা হলো সার্জারি। এতে সিস্টটি সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা হয় এবং পিত্তরস ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবাহের জন্য একটি নতুন পথ তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে হেপাটিকোজেজুনোস্টোমি বা হেপাটিকোডিওডেনোস্টোমি বলা হয়। সার্জারির মাধ্যমে সিস্ট অপসারণ করলে পিত্তরস স্বাভাবিকভাবে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবাহিত হয় এবং লিভারের ক্ষতি কমে যায়। চিকিৎসার সময় শিশুর লিভারের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সার্জারির পর শিশুকে নিয়মিত ফলো‑আপ করতে হয় এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হতে পারে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা হয় যাতে হজমে সমস্যা না হয় এবং শিশুর সুস্থতা বজায় থাকে।
- সার্জারি: সিস্ট সম্পূর্ণভাবে অপসারণ
- নতুন পথ তৈরি: হেপাটিকোজেজুনোস্টোমি/হেপাটিকোডিওডেনোস্টোমি
- অ্যান্টিবায়োটিক: সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োগ
- ফলো‑আপ: নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ
৬) জটিলতা (Complications)
কোলেডোকাল সিস্ট অপসারণ না করলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ জটিলতা হলো সিস্টে সংক্রমণ (Cholangitis), যেখানে পিত্তনালীতে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে প্রদাহ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় পিত্ত জমে থাকলে লিভারের ক্ষতি হয় এবং সিরোসিস তৈরি হয়। সবচেয়ে গুরুতর জটিলতা হলো দীর্ঘমেয়াদে পিত্তনালীর ক্যান্সার (Cholangiocarcinoma) হওয়ার ঝুঁকি। তাই সিস্ট অপসারণ করা অত্যন্ত জরুরি। অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রতিটি লক্ষণ গুরুত্বের সাথে দেখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
- Cholangitis: সিস্টে সংক্রমণ
- Cirrhosis: পিত্ত জমে লিভারের ক্ষতি
- Cholangiocarcinoma: দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি
৭) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
কোলেডোকাল সিস্ট একটি গুরুতর জন্মগত রোগ হলেও সময়মতো চিকিৎসা করলে শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। অভিভাবকদের উচিত শিশুর জন্মের পর যদি পেটব্যথা, ফোলাভাব, জন্ডিস বা অস্বাভাবিক মল‑প্রস্রাব দেখা যায়, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। নিজে থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া বা চিকিৎসা বিলম্ব করা বিপজ্জনক হতে পারে। শিশুকে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান, বিশেষায়িত খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করুন এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতন থাকুন। অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রতিটি লক্ষণ গুরুত্বের সাথে দেখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলো‑আপ করানো।
- ডাক্তার দেখান: অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত
- নিজে চিকিৎসা নয়: ওষুধ বা বিলম্ব এড়িয়ে চলুন
- খাদ্যাভ্যাস: হজমে সহায়ক খাবার ও পর্যাপ্ত পানি
- সংক্রমণ প্রতিরোধ: নিয়মিত ওষুধ ও পরিচ্ছন্নতা
- ফলো‑আপ: নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ
শেষ কথাঃ
কোলেডোকাল সিস্ট শিশুদের মধ্যে একটি গুরুতর জন্মগত রোগ, যা সময়মতো চিকিৎসা না করলে সংক্রমণ, সিরোসিস এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে সার্জারির মাধ্যমে সিস্ট অপসারণ করলে শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। অভিভাবকদের উচিত শিশুর প্রতিটি লক্ষণ গুরুত্বের সাথে দেখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। মনে রাখুন, পেটব্যথা, জন্ডিস বা অস্বাভাবিক মল‑প্রস্রাব কখনো অবহেলা করবেন না। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান এবং নিয়মিত ফলো‑আপ করুন। 250464
