শিশুদের পোড়া রোগ (Burn): একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা — ১২টি মূল দিক

শিশুদের পোড়া রোগ একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা। সাধারণত শিশুদের ক্ষেত্রে তিনভাবে পোড়া হয় — আগুনে পোড়া, গরম পানি বা খাবারে পোড়া এবং ইলেকট্রিক বার্ন। যেহেতু শিশুদের ত্বক পাতলা থাকে, তাই সামান্য তাপেও গভীর পোড়া হতে পারে। এছাড়া শিশুদের শরীর থেকে পানি ও তাপ দ্রুত হারায়, ফলে ফ্লুইড ব্যালান্স ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।

১) পোড়ার ধরন (Types of Burn)

শিশুদের পোড়া সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রতিটি ধরনের পোড়ার আলাদা বৈশিষ্ট্য ও জটিলতা রয়েছে।

  • আগুনে পোড়া: আগুনের সংস্পর্শে এলে ত্বক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • গরম পানি/খাবারে পোড়া: রান্নাঘরে দুর্ঘটনা বা গরম খাবার পড়ে গেলে শিশুদের ত্বক পুড়ে যায়।
  • ইলেকট্রিক বার্ন: বৈদ্যুতিক তার বা যন্ত্রের সংস্পর্শে এলে গভীর পোড়া হতে পারে।

শিশুদের ত্বক পাতলা হওয়ায় সামান্য তাপেও গুরুতর ক্ষতি হতে পারে।

২) প্রাথমিক ব্যবস্থা (First Aid)

শিশু পোড়া রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সঠিকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলে ক্ষতির মাত্রা অনেক কমানো যায়।

  • তাপের উৎস থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
  • পোড়া জায়গায় ১০ মিনিট ধরে স্বাভাবিক ঠান্ডা পানি (বরফ নয়) ঢালতে হবে।
  • পোড়া অংশের চারপাশের ঢিলা কাপড় সরাতে হবে।
  • ফোস্কা ফাটানো যাবে না, এতে ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে।
  • জীবাণুমুক্ত গজ বা পরিষ্কার পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

এই প্রাথমিক ব্যবস্থা শিশুর জীবন বাঁচাতে এবং জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।

৩) হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশনা

সব ধরনের পোড়া রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি নয়। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে অবশ্যই হাসপাতালে নিতে হবে।

  • পোড়া জায়গা শরীরের মোট অংশের ১০% এর বেশি হলে।
  • মুখ, হাত, পা, যৌনাঙ্গ বা বড় জয়েন্টে পোড়া হলে।
  • গভীর পোড়া (সাদা বা কালো হয়ে যাওয়া)।
  • ধোঁয়া বা আগুনে শ্বাসনালী ক্ষতি হলে।
  • বৈদ্যুতিক বা রাসায়নিক পোড়া হলে।
  • ৫ বছরের কম বয়সী শিশু হলে।

এই নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব।

৪) ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট (Fluid Resuscitation)

শিশুরা দ্রুত ডিহাইড্রেট হয়ে পড়ে। পোড়ার কারণে শরীর থেকে প্রচুর পানি বের হয়ে যায়। তাই স্যালাইন দিয়ে ফ্লুইড ব্যালান্স বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

  • শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী স্যালাইন দেওয়া হয়।
  • ফ্লুইড ব্যালান্স বজায় রাখতে প্রস্রাবের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করা হয়।

ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট সঠিকভাবে না হলে শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

৫) অন্যান্য চিকিৎসা

পোড়া রোগীর চিকিৎসায় শুধু ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট নয়, আরও কিছু ব্যবস্থা নিতে হয়।

  • ব্যথা নিয়ন্ত্রণ: প্যারাসিটামল, আইবুপ্রোফেন বা গুরুতর ক্ষেত্রে মরফিন দেওয়া হয়।
  • অ্যান্টিবায়োটিক: সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর।
  • টিটেনাস ইনজেকশন: সব পোড়া রোগীর জন্য প্রয়োজন।
  • প্রতিদিন ড্রেসিং: সিলভার সালফাডায়াজিন ক্রিম ব্যবহার করা যায়।

এই চিকিৎসাগুলো শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

৬) ড্রেসিং ও সার্জারি

পোড়ার গভীরতা অনুযায়ী ড্রেসিং ও সার্জারি প্রয়োজন হয়।

  • Superficial burn: সাধারণত নিজে নিজেই সেরে যায়।
  • Deep burn: স্কিন গ্রাফটিং প্রয়োজন হতে পারে।
  • Contracture prevention: ফিজিওথেরাপি শুরু করা জরুরি।

সঠিক ড্রেসিং ও সার্জারি শিশুর জীবন বাঁচাতে এবং ভবিষ্যতের জটিলতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।

৭) চিকিৎসা (Treatment)

শিশুদের পোড়া রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে পোড়ার গভীরতা, আক্রান্ত অংশ এবং শিশুর বয়সের উপর। প্রাথমিক চিকিৎসার পর হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসকরা ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং ক্ষতস্থানের ড্রেসিং করেন।

  • ব্যথা নিয়ন্ত্রণ: প্যারাসিটামল, আইবুপ্রোফেন বা গুরুতর ক্ষেত্রে মরফিন দেওয়া হয়।
  • অ্যান্টিবায়োটিক: সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর।
  • টিটেনাস ইনজেকশন: সব পোড়া রোগীর জন্য প্রয়োজন।
  • প্রতিদিন ড্রেসিং: সিলভার সালফাডায়াজিন ক্রিম ব্যবহার করা যায়।

চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো শিশুর জীবন বাঁচানো, সংক্রমণ প্রতিরোধ করা এবং ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে দেওয়া।

৮) ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট

শিশুরা পোড়ার কারণে দ্রুত ডিহাইড্রেট হয়ে পড়ে। শরীর থেকে প্রচুর পানি বের হয়ে যায়। তাই স্যালাইন দিয়ে ফ্লুইড ব্যালান্স বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

  • শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী স্যালাইন দেওয়া হয়।
  • প্রস্রাবের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করে ফ্লুইড ব্যালান্স নিশ্চিত করা হয়।

ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট সঠিকভাবে না হলে শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

৯) ড্রেসিং ও সার্জারি

পোড়ার গভীরতা অনুযায়ী ড্রেসিং ও সার্জারি প্রয়োজন হয়।

  • Superficial burn: সাধারণত নিজে নিজেই সেরে যায়।
  • Deep burn: স্কিন গ্রাফটিং প্রয়োজন হতে পারে।
  • Contracture prevention: ফিজিওথেরাপি শুরু করা জরুরি।

সঠিক ড্রেসিং ও সার্জারি শিশুর জীবন বাঁচাতে এবং ভবিষ্যতের জটিলতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।

১০) ফলো‑আপ (Follow-up)

পোড়া রোগীর চিকিৎসার পর নিয়মিত ফলো‑আপ অত্যন্ত জরুরি। কারণ পোড়া জায়গায় সংক্রমণ আবারও হতে পারে বা Contracture তৈরি হতে পারে।

  • ক্ষতস্থানের অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা।
  • ফিজিওথেরাপি চালিয়ে যাওয়া।
  • শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন পর্যবেক্ষণ।

ফলো‑আপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় যে শিশুর শরীর স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে এবং নতুন কোনো জটিলতা হয়নি।

১১) প্রগনোসিস (Prognosis)

শিশুদের পোড়া রোগের প্রগনোসিস নির্ভর করে পোড়ার গভীরতা ও চিকিৎসার সময়ের উপর। ছোট পোড়া সাধারণত ভালো হয়ে যায়। তবে বড় বা গভীর পোড়া হলে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

  • ছোট পোড়া — নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়।
  • গভীর পোড়া — স্কিন গ্রাফটিং ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন।
  • শ্বাসনালী ক্ষতি — জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে বর্তমানে শিশুদের পোড়া রোগ সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব।

১২) অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ

অভিভাবকদের উচিত শিশুর পোড়া হলে দ্রুত প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।

  • শিশুকে তাপের উৎস থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
  • পোড়া জায়গায় ঠান্ডা পানি ব্যবহার করতে হবে।
  • ফোস্কা ফাটানো যাবে না।
  • জীবাণুমুক্ত গজ দিয়ে ক্ষত ঢেকে দিতে হবে।
  • চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত ড্রেসিং করতে হবে।

অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর জীবন বাঁচাতে এবং ভবিষ্যতের জটিলতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।

শেষ কথাঃ (Conclusion)

শিশুদের পোড়া রোগ একটি গুরুতর সমস্যা হলেও সময়মতো চিকিৎসা করলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রাথমিক ব্যবস্থা, ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট, ড্রেসিং ও সার্জারি শিশুর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। 250464