বাচ্চাদের শরীরের ফোঁড়া/ঘা (Abscess): শিশুস্বাস্থ্যের একটি গুরুতর সমস্যা — ৮টি মূল দিক

ফোঁড়া বা Abscess হলো শরীরের কোনো অংশে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণে পুঁজ জমে শক্ত গঠন তৈরি হওয়া। শিশুদের মধ্যে এটি একটি সাধারণ সমস্যা হলেও অনেক সময় গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। ফোঁড়া সাধারণত ত্বকের উপরিভাগে দেখা যায়, তবে শরীরের ভেতরেও হতে পারে। এর ফলে ব্যথা, জ্বর এবং অস্বস্তি দেখা দেয়।

১) ফোঁড়া কেন হয়?

শিশুদের ফোঁড়া হওয়ার প্রধান কারণ হলো ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ। যখন কোনো কারণে ত্বকে ক্ষত হয় বা জীবাণু প্রবেশ করে, তখন শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেই জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। এর ফলে আক্রান্ত স্থানে পুঁজ জমে যায়।

  • ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ — সবচেয়ে সাধারণ কারণ।
  • মশার কামড় বা চর্মরোগের পর ইনফেকশন।
  • চুলকানো বা আঘাতের কারণে জীবাণু প্রবেশ।
  • টিকার স্থানে সংক্রমণ।
  • নিয়মিত গোসল না করা বা জামাকাপড় অপরিষ্কার রাখা।
  • ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।

অতএব, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং শিশুর ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী রাখা ফোঁড়া প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।

২) ঔষধে ভালো হবে?

ফোঁড়ার ভেতরে যখন অনেক পুঁজ জমে যায়, তখন শুধু ঔষধে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ পুঁজের চারপাশে একটি শক্ত আবরণ তৈরি হয়, যা অ্যান্টিবায়োটিককে জীবাণুর কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক দিলেও ভেতরের জীবাণু নষ্ট হয় না। অনেক সময় শরীরের নিজস্ব ইমিউনিটি ফোঁড়াকে শুকিয়ে দেয়, তবে বড় ফোঁড়ার ক্ষেত্রে সার্জারি প্রয়োজন হয়।

৩) অপারেশন না করলে কী হবে?

যদি ফোঁড়ার অপারেশন না করা হয়, তবে ভেতরের পুঁজ আশেপাশে ছড়িয়ে সংক্রমণ বাড়তে পারে। এমনকি পুঁজ রক্তে মিশে গিয়ে সারা শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে, যা শিশুর জন্য মারাত্মক হতে পারে। ফোঁড়া ফেটে গেলে আশেপাশের কোষ নষ্ট হয়, প্রচণ্ড ব্যথা ও জ্বর দেখা দেয়।

  • সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া।
  • রক্তে জীবাণু ছড়িয়ে পড়া।
  • কোষ নষ্ট হয়ে ব্যথা ও জ্বর হওয়া।

তাই সময়মতো অপারেশন করা অত্যন্ত জরুরি।

৪) প্রতিরোধ (Prevention)

শিশুদের ফোঁড়া প্রতিরোধ করা সম্ভব কিছু সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে। অভিভাবকদের সচেতনতা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

  • শিশুকে নিয়মিত গোসল করানো।
  • পরিষ্কার জামাকাপড় পরানো।
  • মশার কামড় বা ছোট ক্ষত হলে দ্রুত পরিষ্কার করা।
  • শিশুর ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী রাখতে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া।

এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শিশুর সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ফোঁড়া হওয়ার ঝুঁকি কমায়।

৫) লক্ষণ (Symptoms)

ফোঁড়া হলে সাধারণত আক্রান্ত স্থানে ব্যথা, লালচে ভাব এবং ফোলা দেখা যায়। সময়ের সাথে সাথে ভেতরে পুঁজ জমে শক্ত গঠন তৈরি হয়।

  • আক্রান্ত স্থানে ব্যথা।
  • লালচে ভাব ও ফোলা।
  • জ্বর ও অস্বস্তি।
  • শিশুর কান্না ও অস্থিরতা।

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।

৬) ডায়াগনসিস (Diagnosis)

ফোঁড়া নির্ণয়ের জন্য সাধারণত শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসক আক্রান্ত স্থানে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন ভেতরে পুঁজ জমেছে কিনা। গুরুতর ক্ষেত্রে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে ভেতরের অবস্থা দেখা হয়।

  • শারীরিক পরীক্ষা।
  • আল্ট্রাসনোগ্রাম।

এই পরীক্ষাগুলো চিকিৎসককে নিশ্চিত করতে সাহায্য করে যে শিশুর ফোঁড়া হয়েছে কিনা এবং কতটা গুরুতর।

৭) চিকিৎসা (Treatment)

শিশুদের ফোঁড়ার চিকিৎসা নির্ভর করে ফোঁড়ার আকার, অবস্থান এবং সংক্রমণের মাত্রার উপর। ছোট ফোঁড়া অনেক সময় শরীরের নিজস্ব ইমিউন সিস্টেমের মাধ্যমে শুকিয়ে যায়। তবে বড় ফোঁড়া হলে চিকিৎসকের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়। শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে বড় ফোঁড়া ভালো হয় না, কারণ ভেতরে জমে থাকা পুঁজের চারপাশে শক্ত আবরণ তৈরি হয় যা ওষুধকে জীবাণুর কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়।

  • অ্যান্টিবায়োটিক: সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, তবে বড় ফোঁড়ায় একা যথেষ্ট নয়।
  • ব্যথা নিয়ন্ত্রণ: শিশুর অস্বস্তি কমাতে ব্যথানাশক দেওয়া হয়।
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার রাখা জরুরি।

চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো ভেতরের পুঁজ বের করে দেওয়া এবং সংক্রমণ সম্পূর্ণভাবে দূর করা।

৮) অপারেশন (Surgical Drainage)

বড় বা গভীর ফোঁড়ার ক্ষেত্রে অপারেশন অপরিহার্য। অপারেশনের মাধ্যমে ফোঁড়ার উপরিভাগে ছোট কাটা দিয়ে ভেতরের সব পুঁজ বের করে দেওয়া হয়। এরপর জীবাণু ধ্বংসের জন্য বিশেষ কেমিক্যাল দিয়ে ভেতর পরিষ্কার করা হয়।

  • Incision & Drainage: সার্জিক্যাল ব্লেড দিয়ে কেটে পুঁজ বের করা।
  • Chemical wash: জীবাণু ধ্বংসের জন্য কেমিক্যাল ব্যবহার।
  • Dressing: প্রতিদিন ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করা।

অপারেশনের সময় আশেপাশের রগ বা শিরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়।

 অপারেশনের পর যত্ন

অপারেশনের পর প্রতিদিন ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করতে হয়। যেহেতু ভেতরে পুঁজ থাকে, তাই কাটা জায়গা সেলাই করে বন্ধ করা যায় না। প্রতিদিন কেমিক্যাল দিয়ে ওয়াশ করে জীবাণুমুক্ত গজ রেখে ড্রেসিং করতে হয়। সাধারণত ৫–৭ দিন নিয়মিত ড্রেসিং করলে ক্ষতস্থান পরিষ্কার হয়ে যায়।

  • প্রতিদিন ড্রেসিং করা।
  • অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া।
  • ক্ষতস্থানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।

ক্ষতস্থান সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত ড্রেসিং চালিয়ে যেতে হয়।

সেলাই লাগবে কি?

সাধারণত শিশুদের ফোঁড়ার ক্ষেত্রে পরবর্তীতে সেলাই দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত ড্রেসিং ও ওষুধ খেলে ক্ষতস্থান নিজে থেকেই শুকিয়ে যায় এবং নতুন ত্বক তৈরি হয়।

 অজ্ঞান (Anesthesia) সংক্রান্ত বিষয়

অপারেশন অজ্ঞান দিয়ে বা অজ্ঞান ছাড়া করা হবে কিনা তা নির্ভর করে ফোঁড়ার আকার, অবস্থান এবং শিশুর বয়সের উপর। বড় ফোঁড়া বা ছোট শিশু হলে সাধারণত অজ্ঞান দিয়ে অপারেশন করা হয়। এতে শিশুর ভয়, কান্না ও নড়াচড়া কমে যায় এবং অপারেশন নিরাপদ হয়।

  • ছোট ফোঁড়া: বড় শিশু হলে অজ্ঞান ছাড়া করা যায়।
  • বড় ফোঁড়া: ছোট শিশু হলে অজ্ঞান দিয়ে করা হয়।

অজ্ঞান সংক্রান্ত বিষয় পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ এনেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ দায়িত্বে থাকেন। অপারেশনের আগে শিশুর বিভিন্ন পরীক্ষা করে দেখা হয় সে অপারেশনের জন্য উপযুক্ত কিনা।

হাসপাতালে থাকার সময়

সাধারণত ফোঁড়ার অপারেশনের পর শিশুকে ১–২ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। এই সময় চিকিৎসক ক্ষতস্থানের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেন।

ড্রেসিং কোথায় করা যাবে?

অপারেশনের পর নিয়মিত ড্রেসিং নিকটস্থ ক্লিনিক বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করা যায়। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী ড্রেসিং করতে হবে।

 অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ

অভিভাবকদের উচিত শিশুর ফোঁড়া হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। নিজে থেকে ফোঁড়া ফাটানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।

  • শিশুকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।
  • ক্ষতস্থানে হাত না দেওয়া।
  • চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত ড্রেসিং করা।
  • অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সময়মতো খাওয়ানো।

অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুর দ্রুত সুস্থতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

শেষ কথাঃ (Conclusion)

বাচ্চাদের শরীরের ফোঁড়া বা Abscess একটি সাধারণ সমস্যা হলেও সময়মতো চিকিৎসা করলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অপারেশনের মাধ্যমে পুঁজ বের করে দেওয়া, নিয়মিত ড্রেসিং এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ শিশুর জীবনকে নিরাপদ রাখতে পারে। 250464